মঙ্গলবার, মে ১৮
শীর্ষ সংবাদ

করোনা: তেলা মাথায় তেল দেওয়া

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 30
    Shares

আবু নাসের অনীক::

দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে যে কঠোরতার কথা বলা হয়েছিলো তার অস্তিত্ব এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রথম দিকে প্রধান সড়কে কঠোরতার ছাপ থাকলেও এখন সেটা মহল্লার অলি-গলির বাঁধাহীন চলাচলের অবস্থায় পৌঁছেছে। অথচ দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতির বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়নি।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে শনাক্তের সংখ্যা ও হারের একটি আর্টিফিসিয়াল গ্রাফ তৈরি করা হচ্ছে। শনাক্ত যখন বেড়ে যায় সরকার তখনই এই পদ্ধতি গ্রহণ করে। ফলশ্রুতিতে সংক্রমণের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব হয় না। ভুল তথ্যের উপর ভিত্তি করে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ। ফলে একদিকে জীবনহানি অন্যদিকে সংক্রমণ দীর্ঘায়িত হয়। কিভাবে সরকার কাঙ্খিত লক্ষ্য অনুযায়ী গ্রাফ তৈরি করে সেটি পূর্বের অনেক লেখায় বিশ্লেষণ করেছি, এখানে আবারও করছি।

গত ৬-১২ এপ্রিল টেস্ট হয়েছিলো ৩ লাখ ৪৬ হাজার, শনাক্ত হয়েছিলো ৪৭ হাজার ৫১৮। ১৩-১৯ এপ্রিল টেস্ট হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার, শনাক্ত হয়েছে ৩১ হাজার ২৬৪। গত সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখিত সর্বশেষ সপ্তাহে টেস্ট কমেছে ৫৫%, শনাক্ত কমেছে ৩৪.১৯%(করোনা.গভ.ইনফো)। টেস্ট কমলেই শনাক্ত সংখ্যা কমে যাবে, সেটিই ঘটেছে। বর্তমান সময়ে শনাক্তের হারও কমে এসেছে। দেখুন, সেটি কিভাবে প্রভাবিত করা যায় নিজেদের অনুকূলে! শনাক্তের হার প্রভাবিত হয় দুইভাবে। টেস্টের পরিমানের কম-বেশি ও স্ক্রীনিং টেস্টের উপর ভিত্তি করে।

ইতিমধ্যে টেস্ট কমিয়ে আনা হয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল থেকে বেশ কয়েকটি দেশের সাথে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওপেন করা হয়েছে। ওপেন করার সাথে সাথে স্ক্রীনিং টেস্ট (বিদেশগামী যাত্রী) বেড়ে গেছে, বর্তমানে মোট টেস্টের ৪০% স্ক্রীনিং টেস্ট। আজকে টেস্ট হয়েছে ২৫ হাজার ৮৯৬, শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৬২৯, শনাক্তের হার ১৪%। এখন এর থেকে ৪০% স্ক্রীনিং টেস্ট বাদ দিলে লক্ষণযুক্ত টেস্টের সংখ্যা ১৫ হাজার ৫৩৭। এই সংখ্যা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২৩.৩০%। সরকারের ঘোষিত হারের তুলনায় ৯.৩% বেশি। দিনের টোটাল টেস্ট এর মধ্যে ৫% এর বেশি স্ক্রীনিং টেস্ট থাকলে তা শনাক্তের হারকে প্রভাবিত করে। কারণ স্ক্রীনিং টেস্ট করা হয় সংক্রমিত নন এটার প্রমাণপত্র নেওয়ার জন্য। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন সংক্রমণের হার কিভাবে প্রভাবিত হয়!

সংক্রমণ বাড়ছে, কমছে নাকি স্থিতিশীল আছে মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও সেটা প্রভাব ফেলে। সে হিসাবে দেখা যায় গত সপ্তাহের তুলনায় সর্বশেষ সপ্তাহে মৃত্যু বেড়েছে ৩৩.৯২%। এটা কোনভাবেই বলার সুযোগ নেই সংক্রমণ কমে গেছে বা যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারংবার স্ক্রীনিং টেস্ট কে লক্ষণযুক্ত টেস্ট থেকে আলাদা করতে বল্লেও সরকার সেটি করছে না।

এভাবেই দিনের পর দিন সংক্রমণ পরিস্থিতির চিত্র নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করছে সরকার। সংক্রমণের এ ধরনের পরিস্থিতিতে লকডাউন ব্যতীত অন্য কোন বিকল্প ছিলো না। লকডাউন জারির পর গাড়িওয়ালা নাগরিকদের ছাড় দিয়ে আইন প্রয়োগের লক্ষ্যবস্তু করা হলো রিক্সাওয়ালা আর শ্রমজীবী মানুষ। প্রধান সড়কগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ির ছড়াছড়ি, স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা শহরে যে পরিমাণ গাড়ি চলাচল করে তার প্রায় ৮০% চলাচল করছে এই সময়ে। তাহলে এ ধরনের লকডাউনের অর্থ কী?

আন্তঃজেলা গণপরিবহন বন্ধ রেখে আভ্যন্তরীণ ফ্লাইট খুলে দেওয়া হয়েছে। যারা বিমানে যাতায়াত করছেন তাদের ঢাকা শহর থেকে করোনা নিয়ে অন্য শহরে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপার থাকছে না!! বিমানে কারা চড়ে মহাশয়? যাদের চড়ার মতো টাকা আছে। অর্থাৎ লকডাউন প্রয়োগ এর আইন টাকাওয়ালাদের কাছে এক রকম, আর যাদের টাকা নেই তাদের কাছে অন্যরকম!!

চলমান কোন নির্দেশনা যখন একই সাথে দুই অংশে দুই রকমভাবে প্রয়োগ হয়, তখন মূল নির্দেশনাটি আদৌও আর প্রতিপালন হয় না কোন অংশেই। এখন ঠিক তাই ঘটছে, এর দায় কার? দায়টি কিন্তু যৌক্তিকভাবে তার উপরেই বর্তায় যে দুই রকমভাবে নির্দেশনাটি প্রয়োগ করছে।

লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ লকডাউনে জীবিকায় যুক্ত থাকতে না পারায় চরম সংকটের মধ্যে আছে। এর বড় একটি অংশের বসবাস ঢাকা শহরে। শহরের দুজন মেয়র নির্লিপ্ত। ভোটের আগে বস্তিতে বস্তিতে ঘুরেছেন, এখন সেই মানুষগুলোর এক বেলার আহার জুটছে কি না তার খোঁজ নেই। উত্তরে ৩৬ টি ও দক্ষিণে ৫৬ টি ওয়ার্ড নিয়ে দুই সিটি কর্পোরেশন। মোট ৯২ টি ওয়ার্ডে ৯২ জন কাউন্সিলর আছেন। যাদের দায়িত্ব স্ব-স্ব ওয়ার্ডের নাগরিকরা কেমন আছে তার দেখভাল করা। দুই মেয়রের মতো তাঁরাও নির্লিপ্ত। খোঁজ-খবর রাখেন গাড়ি-বাড়িওয়ালাদের। অন্য সব ক্ষেত্রের মতো তাদের কাছেও প্রান্তিক মানুষ উপেক্ষিত। জাতীয় উন্নয়নের ভেলায় তারাও ভেসে যাচ্ছে। এই শহরের বাইরে সারা দেশের প্রান্তিক মানুষ নিশ্চয় কোন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা বা ইউনিয়নে বাস করে। হয়তো কোথাও কোথাও কিছু ভূমিকা নেওয়া হচ্ছে যা ব্যতিক্রম। চাহিদার তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল।

লকডাউন বল্লেই সেটি পালন হয় না। পূর্ব প্রস্তুতি, চলমান প্রস্তুতি নিয়ে একটি ব্যবস্থাপনা দাঁড় করাতে হয়। যাকে বলা হয় ‘Lockdown Implementation Management’। এ ধরনের কোন ব্যবস্থাপনা সরকারের নেই। যার কারণে এটির যথাযথ বাস্তবায়ন ব্যর্থ হচ্ছে।

ব্যবস্থাপনার আওতায় প্রথম শর্তই হচ্ছে, প্রয়োগ হতে হবে শ্রেণী নিরেপেক্ষভাবে। লকডাউন ঘোষণার ফলে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের কী ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে সেটি চিহ্নিতকরণ। সে অনুযায়ী সমাধানের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। লকডাউনে যে নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে সেটি মেনে চলায়, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করা।

সরকার বলছে, খোলা জায়গায় বাজার হতে হবে। যেখানে খোলা জায়গায় বাজারের পূর্ব থেকেই ব্যবস্থা নেই, সেটি ব্যবস্থা করতে হবে সরকারের পক্ষ থেকে। ওয়ার্ড কাউন্সিলর/কমিশনারদের ধারণা আছে তার এলাকায় কত সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ আছে। সেই অনুযায়ী লকডাউনকালীন সময়ে তাদের খাবারের অগ্রীম পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। এটা অসম্ভব কোন ব্যাপার নয়। ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়ে বামপন্থী সংগঠনগুলো ‘শ্রমজীবী ক্যান্টিন’, ‘কমিউনিটি কিচেন’ এ ধরনের নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে সরকারের কোন সহযোগিতা ছাড়াই।

যে আইনের অধীনে লকডাউন তার পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ আবশ্যিক একটি বিষয়। লকডাউনের মেয়াদ ২৮ তারিখ পর্যন্ত হলেও ২৫ তারিখ থেকে মার্কেট-শপিংমল খোলার সিদ্ধান্ত দিলেন। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটিকে অকার্যকর করে ফেলা হলো। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যে মার্কেট-শপিংমল চলে না, সেটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তারপরেও খুলে দিলেন ব্যবসায়ীদের চাপে। গার্মেন্টস খুলে রেখেছেন, ব্যক্তিগত গাড়ির অবাধ চলাচল! একেই বলে ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া’।

এতো উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির গান শোনানোর পরেও করোনা প্রতিরোধে সরকারি ব্যয়ে পেছনে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। করোনা মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র জিডিপির ২৫.৫%, যুক্তরাজ্য ১৬.২%, সিঙ্গাপুর ১৬%, জাপান ১৫.৯%, জার্মানী ১১%, চীন ৪.৮%, থাইল্যান্ড ৮.২%, মালয়েশিয়া ৪.৫%, কম্বোডিয়া ৪.১%, কেনিয়া ২.৪% আর সেখানে বাংলাদেশের ব্যয়ের পরিমান ১.৪%। ৪৬০ কোটি ডলারের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় মাত্র ৪০ কোটি ডলার (আইএমএফ)। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার এখনো কতোটা উদাসিন এই তথ্য সেটি নির্দেশ করে।

করোনাকালীন সময়ে ব্যবসায়ীরা বলেই যাচ্ছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সবকিছু শেষ হয়ে গেলো! কিন্তু তথ্য কী বলছে? ১-৫০ কোটি বা তার বেশি টাকা আমানত আছে এমন একাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে ৪ হাজার ৮৬৭ টি। গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এই একাউন্টের সংখ্যা ৮৭ হাজার ৫০০। যাতে প্রায় ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শেষে তার আগের প্রান্তিকের চেয়ে ৩.৮৩% বেড়ে মোট আমানত পরিমাণ হয়েছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা (৩ জানুয়ারী,’২১ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত প্রান্তিক তথ্য প্রতিবেদন)। তারপরেও এই করোনাকালীন সময়ে সরকারের সমস্ত মনযোগ তাদের দিকেই। ফলাফলে সংক্রমণ ও মৃত্যু বৃদ্ধি, সমাজে চরম বৈষম্য সৃষ্টি।

করোনা সংক্রমণ পৃথিবী ব্যাপী দেখিয়ে দিয়েছে পুঁজিবাদী বিশ্বের নগ্ন চেহারা। দেশের মানুষ দেখছে এর আরো নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। কারণ এখানে শাসকগোষ্ঠী লুটেরা। কিন্তু ট্রাজেডি অন্যখানে! যে রিক্সাওয়ালার জন্য যারা কথা বলছে, যে শ্রমজীবী মানুষের জন্য সীমিত সামর্থ্য নিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করছে, অক্সিজেনের অভাব মেটানোর জন্য ছুটে যাচ্ছে, শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছে, ক্ষতিপূরণের দাবি তুলছে, দিন শেষে সেই রিক্সাওয়ালা, অক্সিজেন না পাওয়া বা সেই শ্রমিক নৌকা বা শীষ!!

যারা তাদের শারীরিকভাবে মারছে, ভাতে মারছে, চিকিৎসা সেবা দিতে পারছে না, গুলি করে হত্যা করছে দিনের শেষে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে এই মানুষরাই কিন্তু তাদেরকেই ভোট দিচ্ছে। অর্থাৎ আস্থার সংকট! অনুধাবন করার সময় এসেছে শুধুমাত্র প্রতিবাদ জানিয়েই আর কমিউনিটি কিচেন করে আস্থা অর্জন হয় না। সকল ধরনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে তাদের আস্থার ঠিকানা হয়ে ওঠা ছাড়া এই অবস্থা থেকে মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়।

‘পঙ্গু জীবন; পিচ্ছিল ভীত আত্মা,- রাত্রির বুকে উদ্যত লাল চক্ষু; শেষ নিঃশ্বাস পড়ুক মৌন মন্ত্রে, যদি ধরিত্রী একটুও হয় রক্তিম।।’

লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 30
    Shares