সোমবার, নভেম্বর ৩০

করোনা: কালো রাত কাটে না

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 35
    Shares

আবু নাসের অনীক::

‘এখনো গেল না আঁধার, এখনো রহিল বাধা। এখনো মরণ-ব্রত জীবনে হল না সাধা। কবে যে দুঃখজ্বালা হবেরে বিজয়মালা, ঝলিবে অরুণরাগে নিশীথরাতের কাঁদা।’ আমরা আসলেই জানিনা সেই কাল কবে আসবে! কবে আমরা পরিত্রান পাবো এই সংক্রমণ থেকে। পরিতাপের বিষয় সরকারের পক্ষ থেকে আঁধার দুর করে রৌদ্রজ্জল একটি সকালের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে নেই কোন কার্যকর উদ্যোগ। বরং মনে হয় আঁধারের সাথেই তার সখ্যতা!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন,‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনেক সমালোচনা অনেকে অনেক কিছু করে। কিন্তু আমি মনে করি যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যথেষ্ঠ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। এবং সেই সময়ে তাৎক্ষনিকভাবে যে কাজগুলো করা দরকার ছিল, সেটা কিন্তু যথাযথভাবে করা হয়েছে বলেই এই কোভিড-১৯ কে আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেন তার ভুল কাটিয়ে সঠিক পথে চলতে পারেনা এখানেই তার অন্তর্নিহিত কারণ বিদ্যমান। স্বয়ং সরকার প্রধান যখন সাফল্যের চুড়ান্ত সার্টিফিকেট প্রদান করেন তখন দেশের অধিকাংশ জনস্বাস্থ্যবিদ এমনকি সরকারের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি যখন মন্ত্রণালয়ের কাজের সমালোচনা করে তখন তারা সেটিকে ধর্তব্যের মধ্যে ফেলবেনা এটাই স্বাভাবিক!!

মাননীয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতত্ত্ব বিশ্লেষণ অনুযায়ী সংক্রমণের হার পর পর তিন সপ্তাহ ৫ শতাংশের নিচে এবং মৃত্যুহার আনুপাতিক হারে কমে আসলে তখন বলা যায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। অথচ দেশের বর্তমান সংক্রমণের হার ১২ শতাংশের উপরে এবং মৃত্যুহার ক্রমবর্ধমান তেমন একটি অবস্থায় আপনি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি করা মানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনকে অস্বীকার করা। বিশ্বের ২১৩ টি দেশের মধ্যে মোট সংক্রমণে আপনার দেশের অবস্থান ১৫তম, নতুন সংক্রমণে ১০ম, সক্রিয় সংক্রমণে ১১তম, নতুন মৃত্যুতে ৮ম, মোট মৃত্যুতে ২৮তম, পার মিলিয়ন টেস্টে অবস্থান ১৫৭তম(ওয়ার্ল্ডোমিটার-১৮-০৯-২০২০)। গত এক সপ্তাহে গড় টেস্ট হয়েছে ১৩ হাজার ৪০৮, শনাক্ত ১ হাজার ৬১৩, মৃত্যু ৩২.১৪, শনাক্তের হার ১২.০৩%, মৃত্যুর হার ২% (ওয়ার্ল্ডোমিটার-১৭-০৯-২০২০)। এই তথ্যানুসারে রোগতত্ত্ব বিশ্লেষণ যদি আপনি স্বীকার করেন তবে কোনভাবেই এটা দাবী করা যায় না যে দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল। তাহলে বলতে হবে সমগ্র বিশ্বে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে!! কিন্তু এটা বলারও সুযোগ নেই!

বর্তমান সময়ে শনাক্তের হার কিছুটা কমে আসার কয়েকটি কারণ বিদ্যমান। লোকজন বিদেশ যাওয়ার আগে পরীক্ষা করাচ্ছেন। এই অংশের প্রায় শতভাগ ফলাফল নেগেটিভ আসছে। নন কোভিড রোগীদের চিকিৎসা নেওয়ার আগে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাদের ফলাফলও শতভাগ নেগেটিভ হচ্ছে, করোনা আক্রান্ত রোগী ১৪ দিন পর টেস্ট করছেন তাদের ফলাফলও প্রায় ৯০ শতাংশ নেগেটিভ আসছে। উল্লেখিত তিন শ্রেণির টেস্ট এখন বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ যারা এখন টেস্ট করাচ্ছেন তারা নিতান্ত বাধ্য হয়ে করছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের টেস্ট যদি মোট টেস্টের ৫ শতাংশের উপরে হয় তবে তা শনাক্তের হার কে প্রভাবিত করবে। অর্থাৎ শনাক্তের হারের সঠিক চিত্র উঠে আসবেনা। আর দৈনিক মোট টেস্টের সংখ্যা ২৫ হাজারের কম হওয়াতে শনাক্তের যে হার আসছে এটা প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে না।

সরকার মেকানিজমের মাধ্যমে যেভাবে টেস্টের সংখ্যা কমিয়ে এনে শনাক্তের সংখ্যা কমিয়েছে একইরকমভাবে মেকানিজমের মাধ্যমে সুস্থতার হার বৃদ্ধি করেছে। গত ৩রা মে সুস্থতার মানদন্ডে পরিবর্তন আনে (নিজেদের মতো করে)। একদিন পরেই উল্লেখযোগ্য হারে সুস্থতার হার বাড়তে থাকে। একইভাবে ২৯ জুন সরকার একটি পরিপত্র জারির মাধ্যমে টেস্টে ফি নির্ধারণসহ ৪ টি শর্তারোপ করে যার ফলশ্রুতিতে পরের দিন থেকেই উল্লেখযোগ্য হারে টেস্ট কমে যায়। এই দুটি পদক্ষেপের মাধ্যমে দেশের করোনা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আড়াল করে সরকার তার সাফল্যগাথা প্রচার করছে। যার সাথে বাস্তবতার যোজন-যোজন ফারাক।

করোনাকালে বাংলাদেশে জাতিসংঘের একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যখাতের ওপর মানুষের আস্থা আছে মাত্র ২৩%। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উল্লেখ করছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর আস্থা আছে মাত্র ১৯%, নিম্নমানের ধারনা ৪৬% ও ৩৫% এর ধারনা মধ্যম মানের। বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে এ সমস্ত গবেষণায়। সংকটের এতো ব্যাপকতা থাকা সত্বেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছেনা। বরং সমস্ত প্রকার অব্যবস্থাপনাকে প্রতিনিয়ত অসত্য তথ্য দিয়ে আঁড়াল করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ডা: ভিকারুন্নেসা যিনি নিজে করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন তাঁর অভিজ্ঞতায় তিনি বলেন,‘একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক ও সাবেক কর্মকর্তার পরিচয় দিয়েও আমি সেবা পাইনি। আস্থা রাখতে না পেরে আমি ঝুঁকি নিয়ে ওই হাসপাতাল ছেড়েছিলাম। সাধারণ মানুষ হাসপাতাল বিমুখ কেনো হয়েছে, নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি’। এই অব্যস্থাপনার কারণেই রোগী যথাসময়ে হাসপাতালে আসছে না। যার দরুন সাম্প্রতিক সময়ে করোনায় মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঢামেকের মেডিসিন ও ইনফেকশাস ডিজিজ বিশেষজ্ঞ ডা: ফরহাদ উদ্দিন চৌধুরী মারুফ বলেন,‘এখন মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হতে যায় না, শুরু থেকেই বাসায় থেকেই চিকিৎসা নেবার বিষয়ে বলা হয়েছে, বিশেষকরে বয়স্কদের ক্ষেত্রে- আর এ বিষয়টি মানুষের মাথায় গেথে গিয়েছে। কিন্ত ক্রিটিক্যাল হয়ে গেলে বাসায় চিকিৎসা সম্ভব নয়। এবং রোগী কখন এ ধরনের পরিস্থিতিতে চলে যাচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারছেনা। কারণ অক্সিজেন সাচেরেশান কমে গেলে, শ্বাস কস্টের সমস্যা তৈরি হবার পরেও এটা তীব্র না হওয়া পর্যন্ত রোগী ও তার স্বজনেরা বুঝতে পারছেনা। আর তীব্র হবার পর যখন হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে তখন আর করার কিছু থাকছেনা’। তাতে অবশ্য আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কিছুই যায় আসেনা। তারা এটা ভেবেই প্রশান্তি পাচ্ছে হাসপাতালের বেড ফাঁকা, এটাকেই প্রচারণা চালাচ্ছে রোগী কমে গেছে!

পাবলিক হেলথ এডভাইজারি কমিটির সদস্য জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন,‘আমরা করোনায় মৃত্যুকে এত স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে গেছি-একে ধর্তব্যের ভেতরেই আনছিনা। অথচ সংক্রমণ চলছে এবং সেই সংক্রমণে যারা ‘হাই রিস্ক পপুলেশন’ তারাই মারা যাচ্ছেনা। সংক্রিমতদের নিয়মিত ভিত্তিতে ঘনঘন ফলোআপ করতে হবে। তাদের মধ্যে আবার ‘সিরিয়াস ইল’ যারা আছেন তাদেরকে নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা-পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই ধারাবাহিকতাতেও যদি একজন মানুষকেও বাঁচানো যায়, সেটাই হবে স্বার্থকতা’। অন্যদিকে সরকারের তরফ থেকে কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে অন্যতম স্বার্থকতার মানদন্ড অন্য দেশের তুলনায় এখানে মৃত্যুহার কম। প্রথম থেকে অদ্যাবধি সাফল্যের মানদন্ড হিসাবে এটাই প্রচার করছে। ফলশ্রুতিতে মত্যুহার বাড়বে এটাই তো স্বাভাবিক, কারণ এ বিষয়ে তার নুন্যতম সিরিয়াসনেস নেই। বরং না বাড়াটাই অস্বাভাবিক। কিছু মানুষ মারা যাবে তাতে কী! কোটিপতি তো বাড়বে! সেটা বাড়ানোর জন্যই তো সকল আয়োজন।

বাসে শারীরিক দুরত্ব না রেখে সব আসনে যাত্রী নেওয়ার পর এবার প্লেন ও ট্রেনেও কোন ধরনের শারীরিক দুরত্ব না রেখেই যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। অর্থাৎ সরকার এই মর্মে দেশের জনগণকে নিশ্চিত করছে যে, এখন থেকে আর শারীরিক দুরত্ব বজায় চলার প্রয়োজন নেই। এখন পর্যন্ত করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে যে তিনটি প্রধান শর্ত প্রতিপালন করার কথা বলা হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম শারীরিক দুরত্ব (৬ ফিট )। সেখানে সরকার এই বিধি মেনে চলার আর প্রয়োজনীয়তা দেখছেনা। একেই বলে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার কাছে জীবন তুচ্ছ আর লুটেরা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার কাছে জীবন তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর।

একটু অন্যদিকে আলোকপাত করি। করোনাকালে যেখানে সাধারণ মানুষের আয় কমে গেছে, সেখানে দেশে নতুন করে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ৩ হাজার ৪১২ জন (মার্চ-জুন ২০২০)। এই একই সময়ে করোনার কারণে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে ৭২.০৬ শতাংশ পরিবারের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে যাদের বাৎসরিক আয় ১ লাখ টাকার কম (পিআইবি)। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্ণর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন,‘দেশের কোটি কোটি লোক নিঃস্ব হয়েছে বলেই করোনাকালীন সময়েও সাড়ে তিন হাজার মানুষ নতুন করে কোটিপতি হয়েছেন। ব্যাংক থেকে লুট করা একটি শ্রেণি কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। আবার তারাই হয়তো ব্যাংকে টাকা রাখছেন। করোনাকালে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে। কিন্তু বড় লোক বা ধনীদের আয় বেড়েছে। ব্যাংকে কোটিপতি আমানতকারী বেড়ে যাওয়া তারই প্রমাণ’।

কোটি কোটি মানুষের জীবনকে স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিয়ে সকল বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে মহামারির প্রকৃত তথ্য আঁড়াল করে তথাকথিত সাধারণ জীবনে ঠেলে দেওয়ার অন্যতম কারণই হলো নতুন করে এই সাড়ে তিন হাজার কোটিপতি তৈরি করা। কারণ ’৭১ পরবর্তী সকল সরকারই এই কোটিপতিদের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। এরা রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে কোটিপতি তৈরির কারখানায় পরিনত করেছে। যার দরুন এই করোনাকালেও তারা তাদের কারখানা বন্ধ করেনি। ফলশ্রুতিতে মাত্র তিন মাসেই সাড়ে তিন হাজার প্রডাকশন!! ভাবুন, চিন্তা করুন এদের অধিনেই থাকবেন নাকি নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই সংগঠিত করবেন।

‘নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়, বুক এমন পাথর: অথচ পাথরে একদিন দুর্বশ্যাম কিশলয় জন্ম নেয়; আমার তেমন কোন উত্তরণ, এই দেশে, ঘোর উন্মাদের প্রলাপের মতো মনে হয়।’

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 35
    Shares