মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৩
শীর্ষ সংবাদ

করোনা: উদাসীনতা কার সরকারের না জনগণের!

corona
এখানে শেয়ার বোতাম
  • 91
    Shares

আবু নাসের অনীক::

‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’। এমন উদ্ভট ত্রিভুবনে মেলা খুবই ভার। করোনা সংক্রমণ সুনামীর মতো ধেয়ে আসছে। এই প্রবল স্রোত মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে সরকারের উদ্ভট মার্কা সিদ্ধান্তগুলো তৃতীয় শ্রেণীর কৌতুকের মতো মনে হচ্ছে।

অনেক আলোচনা-সমালোচনার পর তথাকথিত লকডাউন শুরু হয়েছে দেশে। বোঝায় যাচ্ছে এটা কার্যত পরিস্থিতি মোকাবেলায় যথার্থ ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হবে এবং বরাবরের মতো এ বিষয়ে পূর্বের কোন অভিজ্ঞতা এবারও কাজে লাগায়নি। সরকারের এটা জানা ছিলো, লকডাউনের ঘোষণা আসলেই রাজধানী থেকে বাইরে যাবার জন্য জনগণ হুমড়ি খেয়ে পড়বে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এদের সমন্বয়ে পূর্বের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিলো। কিন্তু সরকার সেই পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকলো। গত ২ দিনে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া কে কেন্দ্র করে যে জনাসমাগম ঘটলো সেটা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ১৮ দফা নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কার উদাসীনতা দেখা গেলো, সরকারের!!

আইসিইউ বেডে জায়গা দিতে পারছেন না, সাধারণ বেডও শেষ হয়ে আসছে, অক্সিজেনের অভাবে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে এ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই মানুষ মারা যাচ্ছে এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য লকডাউন ঘোষণা করলেন আর বই মেলা খুলে রাখলেন, এর চেয়ে চরম রসিকতা আর কী হতে পারে। এর পরেও কিভাবে প্রত্যাশা করেন লকডাউন কার্যকর হবে!! এখানেও প্রচন্ডভাবে সিরিয়াসনেসের অভাব।
লকডাউন ঘোষণা করার পরেও অনেক বেসরকারী অফিস তাদের কর্মীদের অফিসে আসতে বাধ্য করছে। গণপরিবহন বন্ধ এমন পরিস্থিতিতে আসতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে আপনাদের প্রজ্ঞাপনের ২(গ) শর্ত ব্যবহার করছে। লকডাউন করা হয় যাতে ব্যক্তির মুভমেন্ট বন্ধ করা যায়, কিন্তু আপনাদের ঘোষিত প্রজ্ঞাপনে যদি সেই ফাঁক থাকে আর নাগরিকদের বাড়তি অর্থ খরচ করে মুভমেন্ট করা লাগে তবে এই লকডাউন অর্থহীন এবং অপ্রয়োজনীয়। কাজের কাজ কিছু হবে না, মাঝখান থেকে শ্রমজীবী মানুষ পড়বে বিপাকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা: নজরুল ইসলাম বলেন,‘সরকার যেটা দিয়েছে সেটা লকডাউন নয়, করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু কর্মসূচি। এতে লকডাউনের কিছু নেই। এই কর্মসূচির মধ্যে রোগী শনাক্ত করে আইসোলেশন করা, টেস্টের ব্যাপারে কিছু বলা নেই’। বোঝা যাচ্ছে কার্যত এটা লকডাউন নয়। গতবারের তুলনায় এবার আরো বেশি সমন্বয়হীন ভাবে চলছে। সিনেমা হল খোলা, বই মেলা চলছে, স্টেডিয়ামে খেলাধুলা হচ্ছে, অনেক অফিস খোলা রাখা হয়েছে। গতবারেও যেমন সিদ্ধান্তের স্ববিরোধীতা ছিলো, এবারও ঠিক তাই, তবে পরিমানে এবার অনেক বেশি। গত বছরের তুলনায় যেখানে আরো বেশি গুছিয়ে করার প্রয়োজন ছিলো, সেখানে পরিস্থিতি যত বেশি নাজুক ততবেশি অগোছালো।

গত সপ্তাহে (২৩-২৯ মার্চ) শনাক্ত হয়েছিলো ২৭ হাজার ২০৮, মৃত্যু হয়েছে ২২৯, সংক্রমণের হার ছিলো ১৫%। চলতি সপ্তাহে (৩০ মার্চ-৫ এপ্রিল) শনাক্ত হয়েছে ৪৩ হাজার ৫৪৪, মৃত্যু ৩৬৯, সংক্রমণের হার ২২.১৪%। গত সপ্তাহের তুলনায় চলতি সপ্তাহে সংক্রমণ বেড়েছে ৬২.৪৮%, মৃত্যু বেড়েছে ৬২.০৫%, সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে ৬৮.১৮% (করোনা.গভ.ইনফো)। দেশে এখন ভাইরাসের রিপ্রোডাকসন রেট ১.৩৪ অর্থাৎ এখন ২ জন থেকে ৩ জনে ছড়াচ্ছে। এই রেট একের উপর থাকলেই তাকে মহামারি পরিস্থিতি হিসাবে ধরা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ডা: আতিকুল হক সংক্রমণ পরিস্থিতির বিপর্যয়কর অবস্থা সম্পর্কে বলেন,‘এতোদিন করোনা আক্রান্তদের জন্য আইসিইউ পেতে সমস্যা হচ্ছিল। এখন সাধারণ বেডও মিলছে না। ওয়ার্ডগুলোও ভর্তি। ডেডবডি নামলেই বেড খালি হচ্ছে। অবস্থা কিন্তু এমনই খারাপের দিকে যাচ্ছে’।

আমাদের এখন ফিল্ড হাসপাতাল করার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উপরের তথ্যই বলে দিচ্ছে সংক্রমণ পরিস্থিতি এই মুহুর্তে একটা বিস্ফোরণমুখ পরিস্থিতির মধ্যে আছে। আইইডিসিআর এর উপদেষ্টা ডা: মুশতাক আহমেদ বলেন,‘আমরা খুব খারাপ পর্যায়ে আছি। আমাদের এখানে যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তাতে সংক্রমণের বিস্ফোরণ ঘটতে চলেছে’। এরপরেও সরকারের পক্ষ থেকে যতটা দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন সেটার এখনও প্রচন্ড অভাব।

এ ধরনের সংকটময় সময়ে সরকারের একটা অলআউট লকডাউন করা উচিত অন্ততো দুই সপ্তাহের জন্য। এবং এই সময়কালীন শ্রমজীবী মানুষের দায়িত্ব যেমন নিতে হবে একই সাথে ক্ষুদ্র-মাঝারি যে সমস্ত ব্যবসায়ী আছে তাদের জন্যেও প্রণোদনা ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। যে অবস্থায় আমরা আছি সেখান থেকে পরিত্রাণ পাবার বিকল্প কোন উপায় নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: সায়েদুর রহমান বলেন,‘লকডাউনকে এবার লকডাউন হিসাবে মানতে হবে। আগের সাধারণ ছুটির মতো দেখলে হবে না। চার থেকে পাঁচটি শহরে কারফিউ দেওয়া দরকার’। অন্যদিকে আমাদের সরকারের ভাবনা কী, ব্যবহারিক কার্যক্রম কী??

সরকারের উদাসীনতা, সমন্বয়হীনতা আর দায়িত্বহীনতাই জনগণের কাছে ভুল ম্যাসেজ দিচ্ছে। তারা ভুলভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। তাদের মধ্যে সরকারের উদাসীনতা সঞ্চারিত হচ্ছে। পরিস্থিতির গভীরে প্রবেশ করছেনা। যখন ১৮ দফা নির্দেশনা উপেক্ষা করে লাখ লাখ শিক্ষার্থী জড়ো করে মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করলেন, এতা কিছুর মধ্যেও সিনেমা হল খুলে রেখেছেন তখন তার প্রতিক্রিয়াতে জনগণ উদাসীন হবে এটাইতো স্বাভাবিক।

মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি উল্লেখ করে গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজের সহযোগি অধ্যাপক ডা: নাজনিন হোসেন বলেন,‘গত বছর এই সময়ে হাজার হাজার গার্মেন্টস কর্মীকে ঢাকায় আনার জন্য কঠিন ভাষায় আমরা চিকিৎসকরা এফবিসিসিআইয়ের সমালোচনা করেছিলাম। ঈদের শপিংয়ে ভিড় করা নারী-পুরুষদের নিয়ে ব্যঙ্গ-রসিকতা করেছি। সবার কাছে ক্ষমা চাই। দ্বিতীয় ও ভয়ঙ্কর ওয়েভের শুরুতেই সবার আগে এই সুযোগটা এবার আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগই নিলো। মাননীয় স্বাস্থ্য বিভাগ দয়া করে আর কাউকে স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলবেন না’। জনগণের স্বাস্থবিধি না মানার ক্ষেত্রে আপনাদের এ ধরনের একের পর এক অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকান্ডই দায়ী।

এরপরেও আপনারা তোতা পাখির মতো বলতেই থাকবেন ‘জনগণ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না’। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার জন্য জনগণ দায়ী। যখন কোন জনবিরোধী সরকার কোন বিষয়ে ব্যর্থ হয় তখন তার দায় জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়া বহু পুরোনা একটি কৌশল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে বারেবারেই বলা হচ্ছে, সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য জনসম্পৃক্ততা তৈরি করতে। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ব্যতীত এই ভয়ানক মরণঘাতি পরিস্থিতি থেকে কোনভাবেই বের হওয়া সম্ভব নয়। অথচ সেখানে একটা বড় ধরনের ঘাটতি। বলা হচ্ছে মহামারিকালীন সময়ে অবাধ তথ্য প্রবাহ থাকতে হবে, সেখানেও ঘাটতি। কোন বিষয় পরিস্কার দিকনির্দেশনা নেই। সর্বস্তরে অস্বচ্ছতা।

নিজেদের এতো বড় অর্থনীতির দেশ মনে করেন তাহলে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় থাকেন কেনো?? ১৪ দিন জনগণের দায়িত্ব নিতে কেনো ব্যর্থ হচ্ছেন?? এই তো মাত্র ১৪ মাস পূর্বে মাননীয়া, আপনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন,‘অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এখন সিঙ্গাপুরের চেয়েও শক্তিশালী। ব্যাংকে টাকার কোন সমস্যা নেই। টাকা আছে বলেই সেবা খাত, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন চলছে’।
গত ১২ বছরে শুধুমাত্র ব্যাকিং সেক্টরে যে লুটপাট হয়েছে সেই অর্থ যদি উদ্ধার করে খরচ করা যায় তবে তিন মাসেরও বেশি সময় শ্রমজীবী জনগণের দায়িত্ব সরকারের পক্ষে নেওয়া সম্ভব। গত ৪ বছরেই ব্যাকিং খাতে লুট হয়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকা, মোট অনিয়ম ঘটেছে ৫৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা (সিএজি রিপোর্ট-২০১৮-২০২১)। সবই জনগণের অর্থ!!

মাননীয়গণ, এখনকার এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি যদি মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হন, তবে ভবিষ্যৎ এ যে লুটপাট করবেন সেই সুযোগও থাকবেনা। যে ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র জারি রেখেছেন আগামীতে সেটি টিকিয়ে রাখতে গেলেও এই পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটিয়ে সেটি সম্ভব হবেনা। অনতিবিলম্বে ‘সংক্রামক রোগ(প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল)আইন-২০১৮’ এর আওতায় দেশে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করুন। সংক্রমণ প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগ করুন যথাযথভাবে, মানুষের জীবন রক্ষা করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুন।

লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 91
    Shares