বুধবার, নভেম্বর ২৫

করোনায় মানসিক সংকট গভীর হচ্ছে

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 8
    Shares

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ

অধিকার ডেস্ক:: করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাসাতেই প্রাথমিক চিকিৎসা নিচ্ছিলেন নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সরদারপাড়া এলাকার রিমন সাউদ। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একপর্যায়ে সেখানে তার মৃত্যু হয়। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে আসেন বাবা ইয়ার হোসেন। আকস্মিকভাবে তারও মৃত্যু হয় সেখানেই। ইয়ার হোসেন পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন এবং ঘটনার দিন তিনি বাসা থেকে হেঁটেই বের হন।

চট্টগ্রামের পটিয়ার ঘটনা আরও মর্মস্পর্শী। পটিয়া উপজেলার ভান্ডারগাঁও গ্রামের মুকুন্দ বড়ূয়া নিজের দুই কিশোরী মেয়েকে মেরে নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে ওইদিনই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করেন। এক দিন পর তিনিও মারা যান। বিপত্নীক মুকুন্দ বড়ূয়া খুলনার একটি লাইটার জাহাজে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। চলতি বছরের মার্চ মাসে লকডাউন শুরু হলে তিনি খুলনা থেকে বাড়িতে চলে আসেন। একপর্যায়ে তার চাকরি চলে যায়। স্বজনদের ধারণা, চাকরি হারিয়ে মানসিক আঘাতের কারণেই তিনি এমন করেছেন।

প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা থেকে এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর করোনা মহামারির প্রভাব মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে করোনায় পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন হারিয়েছেন। কারও কারও উপার্জন কমে গেছে। আবার কেউ কেউ চাকরি হারিয়েছেন। কেউবা চাকরি হারানোর ভয়ে আছেন। এসব কারণে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সহায়তার প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মনোবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, করোনার প্রভাব বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর ভিন্নভাবে পড়ছে। কেউ হয়তো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে না পারায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। আবার কেউ চাকরি হারিয়ে, কেউ স্বজন হারিয়ে মানসিক সমস্যায় পড়েছেন। এই মহামারি শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষকে নতুন মানসিক সংকটে ফেলেছে। নতুন বাস্তবতায় অনেকে এখনও ঘরে বসে অফিস করছেন। শিশুরা স্কুলের ক্লাস করছে ঘরে বসে। পরিবারের সদস্য, স্বজন ও সহকর্মীদের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হচ্ছে। এই ভয় দূর করে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে অনেকে মানসিক ভারসম্য হারিয়ে ফেলছেন।

চিকিৎসক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ডা. মোহিত কামাল বলেন, করোনা সংক্রমণের পর মানসিক রোগে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন করোনাজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। বাবার করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর আইসোলেশনে চলে যাওয়া কিংবা হাসপাতালে ভর্তির কারণে তার শিশুসন্তানের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, যুক্তরাজ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারীদের ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, মহামারির কারণে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হয়েছে। ইতালি ও স্পেনে শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। কানাডায় ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ২০ শতাংশ হারে বেড়েছে মদ্যপান। মহামারির আগের তুলনায় এপ্রিলে ইথিওপিয়ার মানুষের মধ্যে বিষণ্ণতা তিন গুণ বেড়েছে।

এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য :অধিক বিনিয়োগ-অবাধ সুযোগ।’ দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

পদক্ষেপ জরুরি, মত বিশেষজ্ঞদের :করোনাভাইরাস মহামারির মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও এখন বৈশ্বিক আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এগুলো হলো- মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, উন্নতি ও যত্নে পুরো সমাজকে যুক্ত করার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে এবং করোনার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দেশিকাও তৈরি করেছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির এ সময়ে শিশুর মনের যত্ন মা-বাবা কীভাবে নেবেন সে সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংস্থাটির পক্ষ থেকে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

করোনা-সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটিও করোনাকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণে স্বাস্থ্য বিভাগকে পরামর্শ দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৭ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ-সংক্রান্ত ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সভাও করেছে। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরাও।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সবসময়ই অবহেলিত। করোনাকালে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। বিশেষ করে আগে থেকে মানসিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিরা করোনার কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন কম হচ্ছেন। এতে তাদের সমস্যা বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনাজনিত বহুবিধ মানসিক সমস্যা। এসব সমস্যা বিবেচনায় নিতে হবে। বরাদ্দ বাড়িয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. সহিদুল্লা বলেন, কভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে ব্যক্তি ও তার স্বজনদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বাস্তব পরিস্থিতি জানতে একটি গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেজ্ঞদের সমন্বয় করে একটি মঞ্চ গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে গণমাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রচার চালানোর পাশাপাশি টেলিফোনে বিনামূল্যে ২৪ ঘণ্টা সেবা পাওয়ার বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।

সমস্যা হলে জরুরি পরামর্শ নিন :সম্প্রতি দেশের শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে পরিচালিত এক অনলাইন জরিপে দেখা যায়, ৪০ শতাংশ মানুষ মানসিক চাপে রয়েছেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনায় বিশ্বজুড়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সব দেশেই ঘরে থাকার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে সব বয়সী মানুষের মানসিক চাপে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ সময়ে শিশু-কিশোরসহ যে কারও মধ্যে উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, বিষণ্ণতা বা অবসাদ, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষত আগে থেকেই কোনো মানসিক কিংবা মাদকের সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের লক্ষণগুলো বেড়ে যাবে।

করোনা মহামারির সময় মনের ওপর চাপ কমাতে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ তুলে ধরে ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, খাবার, ঘুম ও ব্যায়ামের রুটিন ঠিক রাখতে হবে। ঘরে থাকাকে বন্দি বলে মনে করা যাবে না। পড়ালেখা করা, নিজের যত্ন নেওয়া, বই পড়া, মুভি দেখা বা ব্যক্তিগত কাজগুলো করে যেতে হবে। দিনে দুইবারের বেশি করোনাবিষয়ক সংবাদ দেখার প্রয়োজন নেই। নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মচর্চাও অনেকের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করবে। পরিবারের কাজ সম্মিলিতভাবে করলে সবারই ভালো লাগবে। যাদের ধূমপান বা অন্য কোনো মাদক গ্রহণের অভ্যাস ছিল, তাদের সে অভ্যাসগুলো ত্যাগ করতে হবে। সামাজিকভাবে সংযুক্ত থাকতে হবে, তবে ইন্টারনেটে আসক্ত হওয়া চলবে না। সন্তানের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

কর্মসূচি :করোনা পরিস্থিতির কারণে সীমিত পরিসরে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আজ সকালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

 


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 8
    Shares