শনিবার, জানুয়ারি ২৩

করোনায় বাজেট ও আমজনতার পাটিগণিত

এখানে শেয়ার বোতাম

রাজেকুজ্জামান রতন ::

করোনা সংক্রমণের হার, সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা এবং মৃত্যুর সংখ্যা সবই বাড়ছে। প্রতিদিন আড়াইটায় টিভির সামনে বসে স্বাস্থ্য বুলেটিন শুনে ঘন ঘন মাথা নাড়া আর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলা একটা রুটিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের। যা হচ্ছে তা নিয়ে হাহাকার আর যা হতে যাচ্ছে তা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন মধ্যবয়সী মধ্যবিত্ত, মা এবং গৃহিণীরা। ছাত্র এবং যুবকরা ভাবছেন অন্য কিছু। শ্রমজীবীরা ভাবছেন জীবিকার সংস্থান না হলে জীবন বাঁচবে কীভাবে! সবাই ভাবছেন সুরক্ষিত থাকার নামে এই বন্দিত্ব আর কতদিন স্থায়ী হবে? বাসা ভাড়া, বাজার খরচ, টিউশন ফি জোগাড় হবে কীভাবে? আয়ের খাত স্থবির হয়ে গেলেও ব্যয়ের গতি তো কমেনি বরং বেড়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। ধারণা করা হয় দেশে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ১২ কোটি মানুষ দরিদ্র্য এবং দারিদ্র্য ঝুঁকিতে, নিম্ন মধ্যবিত্ত আর মধ্যবিত্ত সাড়ে চার কোটি আর ৪৪ লাখ ধনী। করোনা প্রচণ্ড ঝাঁকি দিয়েছে সাড়ে ১৬ কোটি মানুষকে।

এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য বিপর্যয় হিসেবে করোনা সংক্রমণ শুধু স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রের অবহেলা ও মানুষের অসহায়ত্ব তুলে ধরেছে তাই নয় উন্মোচন করেছে উন্নয়নের এত গল্প সত্ত্বেও অর্থনীতির দুর্বলতা কোথায়। রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আয় করে যে খাত সেই গার্মেন্টস খাতের নড়বড়ে চেহারা আর মালিকদের দায় না নেওয়ার মানসিকতা থেকে এটা পরিষ্কার হয়েছে যে প্রণোদনা, মুনাফা আর শ্রম শোষণের মধ্য দিয়ে যে খাতের বিকাশ, অর্থনৈতিক দুর্যোগে তারা কতটা সুযোগ সন্ধানী। ৪০ বছরের শিল্প মাত্র ৩ মাসে এতটাই কাহিল হয়ে পড়েছে যে রাষ্ট্রের প্রণোদনা অর্থাৎ জনগণের টাকা ছাড়া সে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। এবার প্রমাণ হলো গার্মেন্টস খাত এমন এক বৃক্ষ যে সে ফুল ফল তো দূরের কথা ছায়াও দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না।

এই করোনায় দেশকে বাঁচিয়ে রেখেছে সবচেয়ে উপেক্ষিত খাত বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক। সাড়ে তিন কোটি টনের বেশি চাল উৎপাদন করে শুধু ভাতের সংস্থান করা নয়, সবজি, মাছ, ডিম, মুরগি, দুধ, মাংস, ফল কোনো কিছুরই অভাব বোধ করতে দেয়নি যে খাত, গত বাজেটেও সেটাই সবচেয়ে উপেক্ষিত ছিল। গত বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বোরো এবং আমন কোনো মৌসুমে সরকার নির্ধারিত ধানের মূল্য না পাওয়া, সস্তা দামে বিক্রি করে সবজি চাষির দুঃখ, মৌসুমি ফল নিয়ে বিড়ম্বনায় উৎপাদক, পোলট্রি খামারির দুর্ভোগ, দাম না পেয়ে এবং বিক্রি করতে না পেরে দুগ্ধ চাষি বিপাকে এসব খবর ছিল পত্রিকার নিয়মিত হেড লাইন।

দেশের অর্থনীতির আর একটি বড় চালিকাশক্তি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত। দেশের অর্থনৈতিক আয়তনের ৫০ শতাংশ সরবরাহ করে এই খাতের শ্রমজীবীরা। তাদের কাজ নেই তো মজুরি নেই। গত ৪ মাসে তাদের জীবন কীভাবে কেটেছে তার বর্ণনা দেওয়া কঠিন। করোনাকালে তাদের কর্মহীনতায় সহায়তা করার জন্য ৭৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল আর সবমিলিয়ে চুরি-চামারিসহ দুই লাখ টন চাল ছিল বরাদ্দ। ৬ কোটি ৩৫ লাখ শ্রমশক্তির সাড়ে পাঁচ কোটি শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের। তারা কতটুকু সহায়তা পেয়েছে তার হিসাব বের করা কঠিন। করোনা এদের নিম্নবিত্ত থেকে দরিদ্রের কাতারে নামিয়ে এনেছে। চিকিৎসা খাতে বাজেট বরাদ্দ ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে বহু বছর ধরে। জিডিপির হিসাবে এই বরাদ্দ ১ শতাংশের কম যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্ব নিম্ন। নিজের টাকায় চিকিৎসার খরচ নির্বাহ করার দিক থেকে বাংলাদেশের জনগণ সর্বোচ্চ খরচকারী।

করোনায় কেন মানুষ টেস্ট করতে চায় না, তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। একজনের টেস্ট করাতে সবমিলিয়ে ৫ হাজার টাকা এবং টেস্ট করানোর ক্ষেত্রে হয়রানি এবং মাসিক আয়ের কথা তুলনামূলকভাবে আলোচনা করলে কেন টেস্ট করাতে অনীহা তা বুঝতে বাকি থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই ৩০ শতাংশ মানুষ করোনায় সংক্রমিত হয়ে গেছেন। চিকিৎসাপ্রাপ্তির আশা সাধারণ মানুষ অনেকটাই ছেড়ে দিয়েছে। কারণ তারা দেখছে অনেক নামি দামি মানুষও করোনায় চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছেন। একটা কথা তো বেশ ভালোই প্রচার পেয়েছে যে, মৃত্যুবরণ করলে আপনি সরকারের কাছে একটি সংখ্যা কিন্তু প্রিয়জনের কাছে অনেক বড় শূন্যতা। অর্থাৎ নিজের দায়িত্ব নিজেই নিন।

প্রবাসী আয়েও বড় ধাক্কা আসবে করোনার কালে এবং তার পরে। বাংলাদেশ থেকে প্রবাসী শ্রমিক যাওয়ার খরচ শ্রমিক প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নগণ্য, রিক্রুটিং এজেন্সির নামে মানব রপ্তানির ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া প্রভাব এখানে। প্রতি বছর গড়ে ৮ লাখ যুবক-যুবতী কাজের সন্ধানে দেশের বাইরে যেত সেটা তো কমবেই সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসা শ্রমিকের সংখ্যা বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়েছে, তেলের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে এবং সহসাই তা বাড়বে বলে মনে হয় না। ফলে ব্যাপকভাবে চাকরি হারাবে প্রবাসী শ্রমিকরা। ইতিমধ্যে ৬ লাখের বেশি ফিরে এসেছে, বিমান চলাচল চালু হলে আরও অনেকেই ফিরে আসতে বাধ্য হবে। ফিরে আশা শ্রমিকদের কাজের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নেবে কে? বার্ষিক ১৭ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে এই প্রবাসী শ্রমিকরাই। যে সব শ্রমিক দেশে ফিরে আসবে তাদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যাপারে বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।

করোনা এবং করোনাপরবর্তী অর্থনৈতিক এই সংকটগুলো সমাধানের দিকনির্দেশনা থাকতে হবে বাজেটে। কিন্তু তার প্রস্তুতি খুব বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে করোনা বিপর্যয় সামাল দিতে সরকার যে সমস্ত প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল তা খেয়াল করলে দেখা যাবে অর্থনীতির ও জনগণের এ সমস্ত বিষয়গুলো সেখানে তেমন গুরুত্ব পায়নি, যতটা গুরুত্ব পেয়েছে বড় ও মাঝারি শিল্পপতিরা। করোনার আঘাত সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও দেখাল যে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার ছাড়া যে কোনো দুর্যোগে টিকে থাকা কত কঠিন আর বিদেশি বাজারের দিকে তাকিয়ে উৎপাদন পরিকল্পনা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কৃষি, কৃষক আর ক্ষুদ্র পুঁজির মালিকরা যদি উঠে দাঁড়াতে না পারে তাহলে দেশের অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।

এ পরিস্থিতিতেই বাজেট আসছে। বাজেট তো শুধু অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ নয় বাজেট একটি অর্থনৈতিক দর্শনও বটে। বাজেটে কে গুরুত্ব পাবে আর কে গুরুত্ব হারাবে তা নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা। কিন্তু বাজেটের অর্থনৈতিক দিকগুলো আলোচনার ক্ষেত্রে যত মনোযোগ পায় নৈতিক দিকের আলোচনা ততটাই অবহেলিত থাকে। বাজেটের আয়ের উৎসগুলো কী, কতখানি আয় করা হবে, ব্যয়ের খাতগুলো কী, কোথায় কতটুকু এবং কেন ব্যয় করা হবে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া দরকার। এ ধরনের আলোচনা হয় না বলে বিগত বছরগুলোতে ঋণখেলাপি, ব্যাংক ডাকাত, টাকা পাচারকারীরা সমস্ত ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এসেছে। এবারের বাজেটেও কি সেই ধারা অব্যাহত থাকবে? এ প্রশ্ন বাজেটের প্রাক্কালে খুবই সংগত। ধারণা করা হচ্ছে সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি আকারের বাজেট হবে এ বছর। করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বরাদ্দ বাড়ানো উচিত তা আমরা শুনছি অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। কিন্তু তা কি বাজেট প্রণয়নে নিয়োজিত যারা তাদের কাছে বা কানে পৌঁছুবে? অতীতের ধারাবাহিকতা থেকে যে ধারণা করা যায় তা হলো, অর্থনৈতিক অবস্থার দোহাই দিয়ে সরকারের আয় বাড়ানোর জন্য ট্যাক্সের আওতা বাড়ানো হবে। রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে আবার খেলাপি ঋণও বাড়বে। ফলে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা, শ্রমজীবীদের রেশন, আবাসন, শিশুদের বিকাশ আর বৃদ্ধদের সুরক্ষার জন্য বরাদ্দে টান পড়বে। ভ্যাটের নামে সব মানুষ ট্যাক্সের জালে আবদ্ধ হবেন আর বড় রুই কাতলা যেমন জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায় তেমনি বড় ব্যবসায়ীরাও ট্যাক্সের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবেন। আটকেপড়া জনগণ বা আমজনতা ছোটবেলায় পাটিগণিতে যে অংক শিখেছিল সেটাই করতে থাকবে অবিরাম। একটি চৌবাচ্চার একমুখ দিয়ে মিনিটে ১০ গ্যালন পানি প্রবেশ করালে এবং অন্য মুখ দিয়ে মিনিটে ১০ গ্যালন পানি বের করে দিলে চৌবাচ্চাটি কতক্ষণে পূর্ণ হবে? চৌবাচ্চা যত বড় করে বানানো হোক না কেন, এই নিয়মে পানি আসা-যাওয়া করলে অংক করা চলতেই থাকবে কিন্তু চৌবাচ্চায় পানি থাকবে না। চৌবাচ্চায় পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথ ও পদ্ধতি বন্ধ না করে যত পানি দেওয়া হোক না কেন চৌবাচ্চা যেমন ভর্তি হবে না, দুর্নীতি ও সে ছিদ্র বন্ধ না করলে ট্যাক্সের আওতা সম্প্রসারণ করেও জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি আর সামাজিক নিরাপত্তার জন্য টাকা থাকবে না। বাজেট প্রণয়নের সময় বাজার অর্থনীতির দিক থেকে মানুষের প্রয়োজনের দিকে মুখ না ফেরালে করোনা-পরবর্তী সমস্যা সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়বে।

লেখক : বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি


এখানে শেয়ার বোতাম