Home মতামত করোনার দিনে করণীয় ও সামাজিক দায়িত্ব

করোনার দিনে করণীয় ও সামাজিক দায়িত্ব

আলমগীর শাহরিয়ার::

আজকের একজন নিয়ে দেশে করোনায় আক্রান্ত দুই জন মারা গেলেন। ঘটনাটি হেলাফেলার নয়। উদ্বেগ ও ভয়জাগানিয়া। যেসব দেশের অবস্থা এখন করুণ তাদের আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা প্রথম দিকে এরকমই ছিল। দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা সরকারের সময়োপযোগী একটা সিদ্ধান্ত ছিল। আজ থেকে যুক্তরাজ্য, চীন, থাইল্যান্ড ও হংকং রুট ছাড়া বিমান চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেহেতু বিদেশ থেকেই আক্রান্তদের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে সুতরাং এ সিদ্ধান্ত আরও আগে নেয়া দরকার ছিল। জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান, খাবার ও ওষুধের দোকান খোলা রেখে অবিলম্বে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস, আদালত, এমনকি মসজিদ, মন্দির, শপিং মল সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা উচিত। উচিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই। অনেক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে তবু দিন পনের বা মাসখানেক সবকিছু বন্ধ থাকলে আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মহামারী এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।

ঘরে বসে যাদের কাজ করার সুযোগ আছে তাদের দ্রুত সে সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত। ইতালির অবস্থা করুণ। প্রতিদিন সেখানে লাশের মিছিল বাড়ছে। ফ্রান্স দুই সপ্তাহের জন্য লকডাউন করেছে। তারা এক মাসের মধ্যে এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ চায়। ইউরোপে শেনজেন সুবিধা প্রত্যাহার করেছে, মানে সীমান্ত বন্ধ, সাধারণের জন্য বিমানবন্দর বন্ধ, মেডিক্যাল ইকুয়েপমেন্ট ব্যতীত আমদানি-রপ্তানি বন্ধ। ফ্রান্স, আমেরিকা, কানাডাসহ অনেক দেশই খাবার ও ওষুধ সামগ্রীর প্রয়োজন ছাড়া নাগরিকদের ঘর থেকে বের না হতে বলছে। প্রয়োজনীয় খাবার দাবার, দরকারি জিনিস ঘরেই পৌঁছে দিচ্ছে। তারমানে দুনিয়া থেকে ইউরোপ, আমেরিকা এখন বিচ্ছিন্নপ্রায়। কোন বিশ্বযুদ্ধের সময়ও পৃথিবী এমন করুণ নির্জন অবস্থা দেখেনি। দেশে দেশে এখন চলাচলে কড়াকড়ি।

একটা গল্প বলি। ঠিক গল্প না। আসলে জীবন থেকে নেওয়া। ‘পেশেন্ট নং ৩১’ নামে এটি আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। সাউথ কোরিয়ায় প্রথম করোনা ভাইরাসের সন্ধান মিলে জানুয়ারির ২০ তারিখে। তারপর পরবর্তী একমাসে আরো ৩০ জন আক্রান্তের সন্ধান মিলল। অনেকেই ভাবল যেখানে প্রতিবেশি চায়নাতে মহামারী চলছে সেখানে ৩০ জন রোগী কিছুইনা এবং এদের কেউই মারা যায়নি। বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে উঠছিলো। তারপর আসলো এক ধাক্কা। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দক্ষিণ কোরিয়ার ছোট্ট শহর দায়েগু যার জনসংখ্যা ২৫ লাখ মাত্র। সে শহরের এক মহিলা গাড়ি এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছিলো এবং মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পথে ছিলেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত হাসপাতালেই সে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হলো।

হাসপাতাল থেকেই সে দুই দুইবার চার্চে গিয়েছিলেন। এমনকি বন্ধুবান্ধব নিয়ে একবার রেস্টুরেন্টে খেতেও গিয়েছিলেন। তারপর আসল খবর আসা শুরু হলো। শত শত রোগী আসা শুরু হলো হাসপাতালে যাদের বেশিরভাগই ঐ চার্চে গিয়েছিলো। আর ঐ রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিলো। তারপর ঐ মহিলার শরীরে করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে। ফেব্রুয়ারির ১৭ তারিখ থেকে মার্চের ১৬ তারিখ পর্যন্ত সাউথ কোরিয়ার টোটাল আক্রান্তের সংখ্যা ৮৫০০ জন। আর মৃতের সংখ্যা ৯৩ জন এবং এর জন্য দায়ী ঐ রোগী নং ৩১! খ্রিস্টানরা চার্চে গিয়েই ফাদারের সাথে হাত মিলায়! সেও মিলিয়েছিলো হয়তো! তারপর দুই সপ্তাহ ধরে সেই ফাদার নিজের অজান্তেই সবার মাঝে পুণ্য বিতরণের তরীকায় ভাইরাস বিতরণ করছিলেন।

অথচ আমাদের দেশে কি চলছে! খোদ সৌদি আরব মসজিদে এসে নামাজ পড়তে মানা করেছে। পবিত্র মক্কা মদিনায় গতকাল জুম্মার নামাজ আদায় হয়নি। মুসল্লীদের ঘরে পড়তে বলেছে। অথচ আমাদের দেশে অনেকে কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ করছেন। পারস্পরিক দূরত্ব(Social Distance), নিয়মিত হাত ধোঁয়া, পরিচ্ছন্নতা এ মুহুর্তে সংক্রমণ থেকে বাঁচার পূর্ব শর্ত হলেও হাজার হাজার লোকজন জড়ো হয়ে প্রার্থনা করছেন। দায়িত্বশীল মহলের কেউ কেউ ঝাড়ু নিয়ে ফটোসেশন করছেন, নাটক করছেন। বিয়ে শাদী, অনুষ্ঠান, উৎসব জারি রেখেছেন। এমনকি দেশে একটি উপনির্বাচন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেল! পৃথিবী দেখল আমরা আসলেই একটা বেকুব জাতি! অথচ এটা কোন নাটকের, উৎসবের সময় নয়। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বাঁচার লড়াই করার সময়।

এসব কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণের ফলাফল কত ভয়াবহ হতে পারে এখনও বুঝতে পারছেন না। অথচ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বলে আমরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। কিছু কিছু বিষয়ে সংবেদনশীলতার দোহাই দিয়ে সরকার ও প্রশাসন রয়েসয়ে চলছে। কিন্তু এটা রয়েসয়ে চলার সময় না। সিদ্ধান্ত নিতে ভুল বা বিলম্ব করারও সময় না। সৌদি আরবের মতো দেশ কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে আজান পর্যন্ত বদলে দিয়েছে। বলছে মসজিদে আসার দরকার নেই ঘরে বসে সালাত আদায় করেন। দেশের মসজিদ, মন্দির, গীর্জায় জনাসমাগম সীমিত করার কোন বিকল্প নাই। প্রশাসনের উচিত শক্ত হাতে বাজার ব্যবস্থা মনিটরিং করা, মেলা, খেলা, পর্যটন স্পট, ওয়াজ মাহফিল, ওরশ, কীর্তন এসব গণজমায়েত যে কোন মূল্যে বন্ধ করা। স্বল্প আয়ের লোকজন যারা দিনে এনে দিনে খান তারা ইতোমধ্যে বিপাকে পড়েছেন। তাদের কথাও ভাবা উচিত। নানা ধরনের গুজব ডালপালা মেলছে। সামনের দিনগুলিতে আরও বাড়তে পারে। সেগুলোও মোকাবেলা করার প্রস্তুতি থাকা দরকার। এই জাতি আইন মানে না। পুলিশ দিয়ে সম্ভব না হলে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া দরকার।

আমাদের সরকার, প্রতিষ্ঠান, জনবলের শক্তি-সামর্থ্য সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত। যে কয়জন মানুষ বিদেশ থেকে আসছিল এদেরই কোয়ারেন্টাইনে রাখতে পারলাম না। এরা পই পই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভয় ও আতঙ্কে সন্দেহভাজন রোগীর হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সারাদেশে হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হলে কি করবেন? ভাবলে হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার কথা। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসায় উন্নত ইউরোপে এমন উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ভীতি বিপর্যয় যুদ্ধের সময়ও মনে হয় না হয়েছে। এখন সারা দুনিয়ার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধেয়ে আসা এই দুর্যোগ প্রতিকার নয়, প্রতিরোধই সর্বোত্তম। প্রতিরোধের জন্য কঠিন কঠোর সিদ্ধান্তের কোন বিকল্প নেই। আশার কথা, এ পর্যন্ত অফিসিয়ালি খুব বেশি আক্রান্তের খবর পাওয়া যায় নি। যদিও আমরা টেস্টই করতে পারছি না। পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। তাই বলে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। যারা বিদেশ থেকে আসছে এদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করুন। পাড়া প্রতিবেশী এদের বাইরে চলাফেরা করতে দেখলে স্থানীয় প্রশাসনকে জানান। সামাজিক উৎসব আয়োজন বন্ধ করুন, বয়কট করুন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া নিজ ঘরে থাকুন। এটা গণসচেতনতার সময়। কিন্তু আমাদের দেশে হচ্ছে উল্টোটা। লোকজন গণঅসচেতনতার পরিচয় দিচ্ছে। মানবজাতি এ এক অদ্ভূত যুদ্ধের মুখোমুখি। যেখানে আততায়ীকে আমরা চিনতে পারছি না। অদৃশ্য এ লড়াই বড় অসম। বড় কঠিন। অবহেলা করলে, সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করলে, দেরী করলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষিত এই প্যানডেমিক বা মহামারীর মাশুল আমরা কিভাবে দেব কেউ জানিনা।

লেখক ও গবেষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

করোনা আক্রান্ত দ্রুত বাড়ছে বাংলাদেশে, ঘরে থাকার বিকল্প নেই

অধিকার ডেস্ক:: দেশে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকদিন ধরে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।...

করোনা আতঙ্কে এগিয়ে আসেনি কেউ, বাবার লাশ কাঁধে নিল চার কন্যা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: করোনা ঠেকাতে ভারতজুড়ে চলছে লকডাউন। প্রতি মুহূর্তে বলা হচ্ছে, বাঁচতে হলে একমাত্র অস্ত্র সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। আর সেই সামাজিক...

মৌলভীবাজারে মৃত ব্যক্তির করোনা শনাক্ত, গ্রাম লকডাউ

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি :: মৌলভীবাজারের রাজনগরে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষায় করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন এই তথ্যের...

করোনার সময়ে একদিনে ব্যাংকে এলেন আড়াই হাজার গ্রাহক

অধিকার ডেস্ক:: টাঙ্গাইলের ব্যাংকগুলোতেও ব্যাপক জনসমাগম। সামাজিক দূরত্বের ধার ধারছে না তারা। রোববার সকাল থেকে এমন চিত্র দেখা গেছে সোনালী ব্যাংক টাঙ্গাইল...