সোমবার, নভেম্বর ৩০

করোনার কাছ থেকে যা শিখলাম

এখানে শেয়ার বোতাম

মাসকাওয়াথ আহসান ::

করোনার কাছে নতুন কিছুই শিখতে হয়নি আমাকে; কারণ আমি জীবনব্যাপী আমার জীবনের আইকন হিসেবে নিয়েছি পরাজিত মেঘদলকে। কবি আবুল হাসান এই পরাজিত মেঘদল শব্দবন্ধটিকে নিয়ে এসেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ‘ইংলিশ-ভিংলিশ’ এক প্রেমিকার কাছে হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল ছিলেন তিনি। কিন্তু ম্যাথু-আর্নল্ড তার স্টাডি অফ পোয়েট্রি গ্রন্থে যে হাইসিরিয়াসনেসের কথা বলেছিলেন; ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র-ছাত্রীরা সে গ্রন্থ পড়ে হাইসিরিয়াসনেস শব্দটির পাদটীকা পড়ে জীবনের গভীরের জীবন দেখার কথা মুখস্ত করে কেবল। ফলে আবুল হাসান “কে ছিলো কী ছিলো কেন সে খুব ‘অভিমান’ করে হয়েছে হিরণদাহ-বিজনব্যথা- হয়েছে আগুন;” তা বুঝে দেখার সময় পায়না বললেই চলে।

কবি আবুল হাসানেরও আগে কবি বিনয় মজুমদার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল ছিলেন। আকুল হয়ে বলেছিলেন, ফিরে এসো চাকা। কিন্তু চাকা ফিরে আসেনি। চাকা এফলুয়েন্ট জীবন চেয়েছে; তার কাছে সাফল্যের সংজ্ঞা যে উদ্দেশ্যহীন ছুটে চলা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে একবার বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এক স্নিগ্ধ তরুণী আমাকে সে আড্ডা থেকে তুলে নিয়ে যায়, তারপর বলে, আপনাকে ভালো লাগে; কিন্তু সারাক্ষণ ‘সোশ্যাল ওয়েল ফেয়ার’ করে বেড়ান! আপনি কী ভেবেছেন; কী হবে আপনার জীবনে!

আমি এই তরুণীর চিন্তার সীমাবদ্ধতাকে বুঝেছি। সে একটা সোশ্যাল কান্ডিশনিং-এ বড় হয়েছে। সেখানে সাড়ে তিন হাজার স্কোয়ার ফিটের একটা এপার্টমেন্ট, লিভিং রুমে নানাদেশ থেকে আনা শো পিস, একটা গাড়ি; মাঝে মাঝে দামি রেষ্টুরেন্টে খাওয়া; ছুটিতে ইউরোপে ঘুরতে যাওয়া; এটা ন্যুনতম একটা চাহিদা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে আমাদের সমাজে।

কমপক্ষে ঐ জীবন অর্জনের জন্য সমুদয় হৈ চৈ চারপাশে। অথচ আমার আব্বা আমাকে বলেছিলেন, “পারিবারিক ব্যবসার ধনী জীবনের চেয়ে আমার বন্ধু প্রতীকের অধ্যাপক বাবার কলকাতার সাদাসিধে জীবন আকৃষ্ট করেছিলো। তাই আমি জীবন বদলে সাদাসিধে জীবন বেছে নিলাম। তোমার সামনে দুটো অপশন, দাদার মতো ব্যবসা করতে পারো; উচ্চবিত্তের জীবন যাপন করতে পারো; কিংবা আমার মতো আনন্দভুক মধ্যবিত্ত হতে পারো।” আব্বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন পড়ে; বাংলাদেশে উনার মনপছন্দ কলেজগুলোতে দর্শন পড়িয়ে আনন্দভুক জীবন কাটিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে দুই শিক্ষক আনিস আহমেদ আর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম; সেই আনন্দভুক মধ্যবিত্ত জীবনটাই যে আমার জন্য ঠিক; এই বিশ্বাস পাকাপোক্ত করলেন। উনাদের বাসায় গিয়ে দেখলাম বই-পুস্তক, স্বাদু খাবার আর আনন্দ আড্ডার জায়গা সেটি।

আমার জীবনে এই তিনজন শিক্ষককে দেখলাম আনন্দময় জীবন কাটাতে। নিজের জীবনকে নিজে সৃজনের যে অপার আনন্দ; তা এঁদের জীবনগাথা থেকে বুঝতে পারি।

এ কারণে করোনার কাছ থেকে নতুন করে আমার কিছু শেখার ছিলো না। আর আমার বন্ধু জুটেছিলো আনন্দভুক ছেলে-মেয়েদের মাঝ থেকে। এতো আত্মবিশ্বাসী ছেলে-মেয়ে তারা; ফেসবুকে আজো দেখি মধ্যবয়েসে রসেবশে কাটিয়ে দিচ্ছে। কেউ ফেসবুক লাইভে কবিতা পড়ছে, কেউ গান গাইছে, কেউ বিতর্ক করছে, কিংবা নেহাত হাহা-হিহির আড্ডা দিচ্ছে। এদের একটা জিনিস কমন; নিজের সামর্থ্যের মাঝে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার করছে। করোনাকালে নিজের পরিচিত মানুষকে নীরবে একটু আর্থিক বা মানসিক সমর্থন জুগিয়ে তার প্রাণপ্রবাহটুকু ধরে রাখতে পারাই সমাজ-কল্যাণ। লোক দেখানো সেলফি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারটা একটা স্থূল মনোভঙ্গি এই ‘গভীর বোধ’ খুঁজে পাওয়া যায় তাদের জীবনে।

হুমায়ূন আহমেদ তার একটি গল্পে দেখিয়েছিলেন, এক শিশু ড্রইংরুমে এসে অতিথিদের সামনে বলে, আব্বা হাইগা আইলাম। বুদ্ধিজীবী বাবা অত্যন্ত বিব্রত হয়ে শিশুটিকে বাড়ির ভেতরে ফেরত পাঠান। এরপর শিশুটি খবরের কাগজে মুড়িয়ে কিছু নিয়ে এসে আবার বলে, হাগা নিয়া আইলাম। শিশুর এই আচরণ খুব স্বাভাবিক। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এমন প্রদর্শনবাদী হলে ব্যাপারটা কেমন দেখায়; তা বোঝাতেই হুমায়ূন আহমেদের এই গল্পের প্রসঙ্গটি নিয়ে আসা।

এই প্রদর্শনবাদিতা থেকেই সাহেদ-সাবরিনা-পাপিয়া-পাপলু-জিকে সিনড্রোম তৈরি হয়। আমরা বাতাবি লেবু টিভিতে বিভিন্ন মন্ত্রীর ত্রাণ বিতরণ; প্রকল্পের ফিতা কাটার ভিডিও দেখে বড় হয়েছি। ফলে টিভি পর্দায় ‘হাগা নিয়া আসা’-টাই আমাদের মিডিয়া কালচার। সে কারণে প্রাইভেট টিভির টকশো হয়ে ফেসবুক লাইভে আমাদের কাজ ঐ একটি; শিশুতোষ প্রদর্শনী।

ফেসবুকে আজ দুবাই তো কাল হনুলুলু-পরশু নিউইয়র্ক-তরশু জেনেভা কাঁপিয়ে বেড়ানোর গল্প দেখলাম একটি দশক। আজ ওয়েস্ট ইনে ডিনার তো কাল গণভবনের পিঠাপুলির আসর, তো পরশু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি; এইসব দেখে মনে হতো; আমরা “দুনিয়া কাঁপানো দশ বছর”-এর চলচ্চিত্র দেখছি। ব্যক্তিক ও রাষ্ট্রিক উন্নয়নের বিপ্লব ঘটে গেছে যেন।

করোনাকালে এসে আমরা দেখলাম; কী অপ্রস্তুত রাষ্ট্রব্যবস্থা-সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা-স্বাস্থ্যব্যবস্থা আমাদের। সাহেদকে গণপিটুনী দিয়ে তার সঙ্গে সেলফি তোলা লোকেরা এসে বলছে, সাহেদ অনেক গিমিক করতে পারতো; তাই আমাদের ব্লাফ দিয়েছে। সতী নারীর পতি হয়ে জাস্টিফিকেশান দেয়া এইসব লোকের গত দশবছরের ফেসবুক স্টেটাস যে গিমিক এবং ব্লাফ; তা তাকে বোঝানো দুঃসাধ্য। যতটুকু বুঝলাম; করোনা পরীক্ষায় ফেইল করেও এদের লজ্জা হয়নি। এরা কোন কিছু থেকে শিক্ষা নেবার পাত্র নয়। এরা নিয়তির সন্তান; সর্বনাশা বদ্ধ চিন্তার মানুষ। কাজেই করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশ আলোকসম্ভবা হবে; সৎ হবে; লুণ্ঠন-রহিত হবে; এ বড্ড দুরাশা।

তবে আশা আছে অল্পবয়েসীদের নিয়ে; যারা এখনো মুক্ত-মাথার মানুষ; নতুন কিছু শেখার, আত্মসংস্কারের গভীর আকাংক্ষা যাদের মনে আছে। কট্টর চেতনাপন্থী-কট্টর ধর্মপন্থী দোকানের সেলস বয় ও গার্লেরা ‘সোনার বাছুর’-এর আরাধনায় বুঁদ; ফলে তারা ভুল চিন্তার অলি-গলিতে ঠোক্কর খেয়ে বেড়াবে এটা নিশ্চিত। কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক নিরপেক্ষ নির্দলীয় তরুণ যারা; যাদের একটাই স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশ; যাদের একটাই স্বপ্নের জীবন; আনন্দভুক দিনযাপন; শুধু নিজের অর্থ-বিত্ত-প্রাচুর্য নয়; সামষ্টিক সহজাত সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা যাদের; দুর্বল শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে; সবল তক্ষক ও লুণ্ঠন বৃত্তির কারণে যে তরুণেরা সিক্স ডিজিটকে জীবনের সাফল্যের সংজ্ঞা বানিয়েছে; প্রধানমন্ত্রীর কাছের লোক; এই রেফারেন্স ছাড়া জীবন মূল্যহীন এমন একটি সহ- রাজসিক ভাবনার ‘খোকন সোনা’ হয়ে ওঠা যাদের জীবনের একমাত্র অভিলক্ষ্য; করোনা তাদের ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।

করোনাকালে এটুকু বোঝা গেলো; এতো টাকা-এতো ক্ষমতার কোন মূল্য নেই। এক মিনিটের নাই ভরসা বন্ধ হবে রং-তামাশা। বাংলাদেশের মানুষ এই প্রথম বিজ্ঞান ও গবেষণার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে। আগে যারা রাজনীতির বাহুবলি ভাইয়ের ‘জয় করে এলাম জাতিসংঘ’, ‘কাঁপিয়ে দেয়া ব্যাংক রিজার্ভ’, ‘পদ্মাসেতুর ১৭ তম স্প্যান বসানোর গল্পে’ অভিনন্দন ভাই বলে ডানা ঝাপটাতো এই আশায় যদি ভাইয়ের নজরে পড়ে ব্যক্তিগত উন্নয়নের চেরাগ হাতে পাওয়া যায়; তারাই এখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা ভ্যাকসিন উদ্ভাবনী গবেষণার সাফল্য নিয়ে আলোচনা করে। সাফল্যের সংজ্ঞা যেন বদলে দিয়েছে করোনাকাল।

লেখক : সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক


এখানে শেয়ার বোতাম