শুক্রবার, জানুয়ারি ২২

করোনাভাইরাস : প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ জরুরি

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 667
    Shares

আলমগীর শাহরিয়ার ::

বাংলাদেশেও ৩ জন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের দুইজন ইতালী ফেরত। আরেকজন তাদের সংস্পর্শে আক্রান্ত। তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে আরও কিছু খবর পাওয়া যাচ্ছে। নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। দেশে দেশে দেবালয়েও এখন উদ্বেগ আতঙ্ক। পৃথিবীর কোনো দেশই এখন আর করোনাভাইরাসের বিপদ ও আতঙ্ক থেকে মুক্ত না। সে আতঙ্কের বিষাদছায়া ঢাকাতেও। কিন্তু আতঙ্ক বা গুজব ছড়ানোর সময় এটা না। এমনিতেই এ দেশ একটা গুজবসন্ত্রাসের উর্বরভূমি। মানুষ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয়ের প্রাথমিক অভিঘাত সামলিয়ে উঠতে পারছে না। যা হোক, এখন আতঙ্কগ্রস্থ সাধারণ মানুষকে ভরসা ও সাহস দেওয়ার সময়। একই সঙ্গে সচেতন ও সতর্ক করারও সময়। সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও দেশের তরুণদের এগিয়ে আসা জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে আমাদের পাবলিক হেলথ নিয়ে কিছু পড়াশোনা করতে হয়েছে। যে শিক্ষক আমাদের পাবলিক হেলথের কোর্স পড়াতেন তিনি প্রায়ই বলতেন ক্যাম্পাসের পাশে ঘিঞ্জি নিউ মার্কেট এলাকায়ই যদি সুস্থ কেউ এমনিতেই ঘুরতে যায় সে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে। কেননা মানুষ এতোটাই গা ধাক্কাধাক্কি করে চলে, একজন আরেকজনের সংস্পর্শে আসে। ঢাকা শুধু ঘিঞ্জি শহর নয়। বিশ্বে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে। মানুষ এমনিতেই এখানে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে। বিশেষ করে বায়ু দূষণে শীর্ষে থাকায় মানুষ শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত নানা জটিলতায় ভুগছে। সম্প্রতি এক সমীক্ষা বলছে, বায়ুদুষণের কারণে ঢাকার মানুষের তিন বছর আয়ু কমছে। যা হোক, উন্নত চিকিৎসা ও প্রযুক্তি সমৃদ্ধ দেশ দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ইতালির মতো দেশ করোনাভাইরাস নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। সবকিছু বন্ধ করে দিচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতি ইতোমধ্যে হুমকির মুখে। দেশে আক্রান্তদের খবর পেয়ে ইতোমধ্যে দীর্ঘ প্রস্তুতির মুজিব বর্ষের অনুষ্ঠান পুনর্বিন্যাস ও সীমিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তড়িৎ রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ঘন বসতিপূর্ণ এ দেশ হিসেবে আমাদের করোনাভাইরাস ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার আগে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। লাল-ফিতার দৌরাত্ম্যে কালক্ষেপণের কোনও সুযোগ বা অবকাশ নেই। যেমন—
ক) সাময়িক সময়ের জন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা। বলা বাহুল্য যে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় শ্রেণিকক্ষ ছাড়াও হল ও হোস্টেলগুলোতে শুধু ধারণ ক্ষমতার বেশি শিক্ষার্থী বাস করে না সেখানে গণরুমে এক সঙ্গে প্রচুর শিক্ষার্থী একটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করে। এদের ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে। হল হোস্টেল ও মেসে থাকা প্রায় সবাই গ্রাম ও মফস্বল শহর থেকে আসা। এরা কোনভাবে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে অন্যদেরও আক্রান্ত করবে এবং ভাইরাস প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত দ্রুত ছড়াবে। মানবিক দুর্যোগ সৃষ্টি হবে। পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
খ) বিমান বন্দর, সমুদ্র ও স্থল বন্দরে আরও সতর্কতা বাড়ানো জরুরি। চেক আপ ছাড়া কাউকে ঢুকতে না দেওয়া। প্রয়োজনে সীমান্ত ও স্থল বন্দর সীলগালা করে দেওয়া। আমাদের বিমান বন্দরে ভিআইপিদের জন্য একটি থার্মাল স্ক্যানার ছাড়া বাকিগুলো নষ্ট। হ্যান্ড চিপ দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে। যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার।
গ) চেক আপ ব্যবস্থা সহজ করা এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দেশের সকল হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স, স্টাফসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখা। প্রয়োজনীয় সহায়ক চিকিৎসা সরঞ্জামাদি দ্রুত আমদানি করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা এদেশের সাধারণ মানুষের এবং প্রশাসনের আছে। বিশ্বে এজন্য বাংলাদেশ প্রশংশিত। মানবিক কোনো দুর্যোগ সৃষ্টি হওয়ার আগেই আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। কোন ধরণের অবহেলা চরম পরিণতি ঢেকে আনতে পারে। সেখানে সরকারকে বর্তমান পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কোন বিকল্প নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO) করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছে। যেমন—
১. বার বার ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া।
২. জনসমাগম এড়িয়ে চলা। মানুষে মানুষে তিন হাত দূরত্বে থাকা নিরাপদ।
৩. চোখে, মুখে, নাকে হাত না দেওয়া।
৪. হ্যান্ডসেক না করা। আলিঙ্গন না করা।
৫. সর্দি জ্বর কাশি ইত্যাদি হলে বাইরে না যাওয়া। চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।
৬. হাঁচি কাশি এলে টিস্যু পেপারে নাক-মুখ ঢেকে রাখা। তারপর টিস্যুটা ময়লার ঝুড়িতে ফেলা। টিস্যু কাছে না থাকলে হাতের কনুই ব্যবহার করা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এছাড়াও কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন—
ফোটানো পানি পান করা, পুষ্টিকর খাবার পরিমিত খাওয়া, ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়া। বিশেষ করে ভিটামিন সি যুক্ত খাবার প্রতিদিন গ্রহণ করা।
দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনে মাস্ক নিয়ে হইচই চলছে। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা মানুষের উদ্বেগ ও আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করে নিচ্ছেন। পাঁচ থেকে পনের টাকার মাস্ক ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। মানুষের বিপদের দিনে এমন ব্যবসা খুবই অমানবিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন আক্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া কারও মাস্ক ব্যবহার করার দরকার নেই। অযথা সাবান, জিবাণু প্রতিষেধক লিকুইড এসব মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করবেন না। একা না, সবাই নিরাপদ থাকলে আপনিও নিরাপদ থাকবেন। সমাজে সবাইকে নিরাপদ রাখার জন্য যেন আমরা মনযোগী হই। সচেতন হই সর্বাত্মক প্রতিরোধে।

লেখকঃ কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 667
    Shares