বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৮

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 187
    Shares

মোহাম্মদ রুবায়েত হাসান ::


সত্যি কথা বলতে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে এই যে খুব প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণালব্ধ তথ্য নিয়ে মিডিয়াতে গরম গরম হেডলাইন হয় বা হচ্ছে তাতে আমার খুব একটা আপত্তি নেই । এর কারন হলো আমাদের দেশে কেউ কেউ এক বসায় আটটি আম খেয়ে ফেললেও পত্রিকার হেডলাইন হওয়া যায় । এ পরিপ্রেক্ষিতে গবেষণায় , বিশেষ করে বর্তমানে করোনাভাইরাস নিয়ে যে কোনো ধরণের গবেষণার অগ্রগতি পত্রিকায় বা অন্যান্য মিডিয়ায় হাইলাইট করা হলে তাতে কোনো ক্ষতি দেখি না, যতক্ষণ পর্যন্ত গবেষণার প্রয়োজনীয়তা বিচারে এবং পরিকল্পনায় বিশেষ কোনো ভুল না থাকে বা অসত্য তথ্যের প্রচার ঘটে। বরং এতে যদি সংশ্লিষ্ট গবেষকরা অনুপ্রাণিত হয়ে কাজের গতি বাড়িয়ে দেন তাতে বরং দেশেরই লাভ । আবার মিডিয়াতে আসার কারণে কারো গবেষণার প্রতি যদি সরকারের নজর পড়ে আর সরকারি সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায় সেটাও মঙ্গল জনক ।

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস যে কাজটি শুরু করেছে তাতে সাধুবাদ জানাই । যেকোনো কিছুরই কোথাও না কোথাও তো শুরু হতে হবে । কিন্তু তাদের দেওয়া তথ্য মতে তারা ভ্যাকসিন ডেভেলপমেন্ট এর কোন পর্যায়ে আছে তা ব্যাখ্যা করছি । ভ্যাকসিন ডিজাইন হয়েছে । পরীক্ষামূলক ভাবে তৈরী করা হয়েছে এবং তা খরগোশে প্রয়োগ করা হয়েছে । খরগোশে ভ্যাকসিন হিসেবে mRNA এর মাধ্যমে তৈরী যে এন্টিজেন ব্যবহার করা হয়েছে ও তার বিরুদ্ধে যে এন্টিবডি তৈরী হয়েছে তার প্রমান ও তাঁরা দিয়েছেন, যদিও খুব কম সংখক স্যাম্পল ব্যবহার করে । কিন্তু খরগোশ বেচারারা যে এন্টিবডি বানালো তা করোনাভারাস প্রতিরোধে সক্ষম তার কি কোনো প্রমান দিয়েছেন? আমার জানা মতে এর উত্তর টা হলো ‘না’ ।

এবং এনিয়ে সঠিক পরবর্তী পদক্ষেপ এর কথাও ঠিক শুনলাম না । এপর্যায়ে যা করতে হবে তা হলো খরগোশের সেরাম নিয়ে ল্যাবরেটরিতে সেল কালচার এ পরীক্ষা করে দেখতে হবে সেরাম এ উপস্থিত এন্টিবডি ভাইরাসের হাত থেকে সেলকে রক্ষা করতে পারে কিনা অথবা ভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করতে পারে কিনা । এই পরীক্ষার নাম হলো সেরাম নিউট্রালাইজেশান পরীক্ষা । খুব খুশি হতাম যদি গ্লোব ফার্মা একাজটি সম্পন্ন করে মিডিয়াতে আসতো । এই ধাপটি সবচেয়ে গুরুত্তপুর্ন কারণ এই ধাপে যদি কাজ না হয় তবে আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে ।

এপ্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন যে বাংলাদেশে সম্ভবত এখনো সেরাম নিউট্রালাইজেশান পরীক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা নেই । এপরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজন বায়োসেফটি লেভেল ৩ ফেসিলিটি যা বাংলাদেশে দু চারটা আছে বলেই জানি । কিন্তু করোনাভাইরাস মোকাবেলায় ছ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো করোনাভাইরাসের কালচার করার কোনো ব্যবস্থা হয়েছে বলে জানা নেই। ১৬ কোটি মানুষের দেশে একটা ল্যাব ও নেই যেখানে করোনাভাইরাস কালচার করা যায় বা সেরাম নিউট্রালাইজেশান পরীক্ষা করা যায় । অথচ এরকম দু চারটা ফেসিলিটি অনেক কারণেই প্রয়োজন যার মধ্যে আছে সম্ভাব্য ভ্যাকসিন এর কার্যকারিতা পরীক্ষা , প্লাজমা ডোনারদের রক্তে নিউট্রালাইজিং এন্টিবডি পরীক্ষা বা এন্টিবডি টেস্টের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা ইত্যাদী ।

দেশে সেরাম নিউট্রালাইজেশান পরীক্ষা করার ব্যবস্থা না করতে পারলে গ্লোব ফার্মার উচিত বিদেশে পাঠিয়ে তাদের স্যাম্পল পরীক্ষা করিয়ে আনা । এপর্যায়ে সফল হলে আরো এনিম্যাল মডেল এ ভ্যাকসিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই বলা যাবে প্রি ক্লিনিক্যালি ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে । তারপর সরকারের অনুমতি মিললে শুরু হবে phase1 , phase2 এবং phase3 ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ।

একাজে যতদিনই লাগুক তারপরেও বলবো কাজ চলুক । এই মহামারী কতোদিন দীর্ঘায়িত হবে তা এখনো জানা নেই । অন্যান্য যেসব ভ্যাকসিন ট্রায়ালে আরো অনেক বেশি এগিয়ে আছে সেসব ভ্যাকসিন শেষ পর্যন্ত কতটুকু কার্যকর হবে বা কবে বাংলাদেশের মানুষের হাতে আসবে সবই তো অনিশ্চিত । আবার এই ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হবে তার গুরুত্তও তো কম নয় । এমনকি ভ্যাকসিন সফল না হলেও এ গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। আফটার অল ফেইলিউর ইজ দা পিলার অফ সাকসেস!

লেখক: ক্লিনিকাল মলিকুলার মাইক্রোবায়োলোজিস্ট, সিদরা মেডিসিন ও সহকারী অধ্যাপক, ওয়েল কর্নেল মেডিকেল কলেজ, দোহা, কাতার


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 187
    Shares