শনিবার, ডিসেম্বর ৫

করোনাকালে ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য

এখানে শেয়ার বোতাম

সাইফুল হক ::

করোনা মহামারীকালেও ধনী-গরিবের বৈষম্য আরও মারাত্মক হয়ে দেখা দিয়েছে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার পার্থক্য আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। মহামারীর এই দুর্যোগের মধ্যেও বাংলাদেশে সম্পদের কেন্দ্রীভবন ও পুঞ্জীভবন ঘটছে। দেশের জনগণের এক বড় অংশের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পেয়ে চলেছে। এ দেশে করোনার উৎপাদন-পুনরুৎপাদনের পাশাপাশি দারিদ্র্যের উৎপাদন-পুনরুৎপাদনও ঘটে চলেছে। আয় ও সম্পদের এই কেন্দ্রীভবন ইচ্ছা-নিরপেক্ষভাবে সমাজে শ্রেণিবিভাজন-শ্রেণি মেরুকরণ আরও স্পষ্ট করে তুলছে। ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ‘সর্বসম্মতিক্রমে ‘পাস হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এই বিভাজন ও মেরুকরণকে আরও বিস্তৃত করার আইনি সুযোগ ও পরিসরকে যে আরও বাড়িয়ে তুলবে, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করার বিশেষ অবকাশ নেই।

করোনার এক অভূতপূর্ব দুর্যোগ উত্তরণে আগামী এক বছরের জন্য যে বাজেট দরকার ছিল, তা পাওয়া গেল না। সংসদে অর্থমন্ত্রী যদিও বলেছেন, কভিড-১৯-এর কারণে যারা কাজ হারিয়েছেন, কষ্টে আছেন, তাদের জন্য এই বাজেট। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সরকারের আমলেও প্রচলিত বাজেটে তেলের মাথায় তেল দেওয়া, অর্থাৎ ধনী-বিত্তবান, কালোটাকা ও অবৈধ সম্পদের মালিক এবং সর্বোপরি লুণ্ঠনপ্রিয় কথিত পুঁজিপতিদের তোষণের যে নীতি-কাঠামো, অগ্রাধিকার ও বরাদ্দ আগামী অর্থবছরের বাজেটেও মৌলিকভাবে তা অক্ষুণœ রাখা হয়েছে। মহামারীকালেও সরকারের রাজস্ব ব্যয়বৃদ্ধি, সামরিক খাতসহ অনুৎপাদনশীল খাতে বর্ধিত বরাদ্দ, কালোটাকা সাদা করার অনৈতিক সুযোগ অব্যাহত রাখা, বিত্তবানদের আয় ও সম্পদের ওপর বর্ধিত কর আরোপ না করা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে চুরি, দুর্নীতি লুট করা অর্থ-সম্পদ উদ্ধারের দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য কোনো পদক্ষেপ ছাড়াই বাজেট গ্রহণ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির জোরালো ও যুক্তিগ্রাহ্য দাবি সত্ত্বেও মহামারীজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা ও দুর্যোগ উত্তরণে স্বাস্থ্য-চিকিৎসা খাত, কৃষি ও গ্রামীণ খাত, কর্মসংস্থান এবং আট থেকে দশ কোটি মানুষের কাছে সরাসরি খাদ্য ও নগদ অর্থ পৌঁছানোর মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ অর্থমন্ত্রী তথা সরকারের কার্যকর মনোযোগ পায়নি। এজন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সর্বোপরি অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের বাজেটে ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে যেভাবে আত্মতুষ্টির ঢেকুর তুলেছেন, তা নিছক কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়। আর উচ্চতর প্রবৃদ্ধি যে উন্নয়নের সমর্থক নয়, গত চার দশকে বাংলাদেশসহ দুনিয়ার তাবৎ দেশেই তার নজির রয়েছে। প্রবৃদ্ধির ‘চুঁইয়ে পড়া’ অর্থনীতি যে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই দারিদ্র্য, না খাওয়া, বেকারত্ব, সীমাহীন আয় ও ধনবৈষম্য লাঘব করতে পারেনি, তা আর নতুন করে প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। এ কারণে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের মতো বিশ্ব সংস্থাগুলো তাদের ঘাড় থেকে প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক উন্নয়নের ভূতকে অনেকটা নামিয়ে ফেললেও অতীতের ধারাবাহিকতায় দেশের অর্থমন্ত্রী অপ্রয়োজনীয়ভাবে কথিত প্রবৃদ্ধির এই ভূতকে মাথায় রেখে দিয়েছেন। প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক এই উন্নয়ন ভাবনা যে বাংলাদেশ, বিশেষ করে এখনকার মহামারী দুর্যোগ উত্তরণে বিশেষ কাজে দেবে না, তা সরকারকে কে বোঝাবে।

প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক এসব উন্নয়ন চিন্তা ও তৎপরতার মধ্যেই বাংলাদেশে প্রায় অবিশ্বাস্য রকম গতিতে অর্থ-সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটে চলেছে। গেল ২৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের বরাত দিয়ে দেশের গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশে গত এক বছরে কোটিপতিদের সংখ্যা বেড়েছে ৮২৭৬ জন। এই সংখ্যা আগের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। সচেতন কারই এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, এটি একটি খণ্ডিত চিত্র। কোটিপতিদের ক্লাবে নাম তোলার সংখ্যা যে বাস্তবে আরও বেশি হবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। গণমাধ্যম প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকের মোট আমানতের ১২ লাখ ১৪ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকার মধ্যে কোটিপতিদের আমানতই হচ্ছে ৪৩.৩৯ শতাংশ। মোট আমানতে কোটিপতিদের অংশীদারত্ব যে দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে, তাও স্পষ্ট। গেল মে মাসে যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্স বাংলাদেশ সম্পর্কে চমকে যাওয়ার মতো আরও তথ্য হাজির করেছে। তাদের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে যেসব দেশে স্বল্পসংখ্যক লোকের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে, এ রকম দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে শীর্ষে। বাংলাদেশ সরকার বা সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান এই তথ্য চ্যালেঞ্জ করেছে, এমন কোনো সংবাদ এই পর্যন্ত নেই। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের অর্থ জমা রাখার প্রবণতা গত এক বছরে কিছুটা হ্রাস পেলেও, গত এক যুগে অর্থ জমানোর গতি ঊর্ধ্বমুখী। আগে সুইস ব্যাংকে আমানতকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার যে ধারা ছিল, তা এখন তুলে দেওয়া হয়েছে। সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এ-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানা ও তা প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। আর অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা জানাচ্ছেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে কমপক্ষে পাঁচ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে; যা বর্তমানে দেশের পুরো অর্থবছরের বাজেটের কাছাকাছি।

এর বিপরীত চিত্র সম্পর্কে কদিন আগে বিআইডিএসের গবেষণা জরিপের তথ্যে উঠে এসেছে যে, করোনা মহামারীর তিন মাসে দেশে নতুন করে ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে। তারা জানাচ্ছেন, এই সময়কালে শহরাঞ্চলে শ্রমজীবীদের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ আর গ্রামাঞ্চলে ১০ শতাংশ। আর করোনা দুর্যোগের আগে দেশে বেকারত্বের হার ছিল ১৭ শতাংশ, নতুন করে বেকার হয়েছেন ১৩ শতাংশ মানুষ। মহামারীর এই দুর্যোগে চাকরি বা কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হওয়া মানুষ মিলে এখন ছয় কোটির ওপর মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে বিবেচনা করা হচ্ছে। করোনা দুর্যোগ যদি এভাবে আরও চার-ছয় মাস অব্যাহত থাকে, তাহলে আরও দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ যে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসবেন, সে আশঙ্কার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আবার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলসমূহ বন্ধ হয়ে গেলে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক নতুন করে বেকারের খাতায় নাম লেখাতে যাচ্ছে। আর করোনাকালে গ্রামাঞ্চলে পোলট্রি, মৎস্য, দুগ্ধ খামারসহ ছোট ও মাঝারিশিল্পের ক্ষতি প্রায় লাখো কোটি টাকা। এসব শিল্পের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি চরম বিপাকে পড়েছে এসবের সঙ্গে যুক্ত কয়েক লাখ মানুষ।

জীবিকা ও আয় হারিয়ে ইতিমধ্যে লাখ লাখ মানুষ ঢাকা, চট্টগ্রাম শহর ও শিল্পাঞ্চল থেকে গ্রামে ফিরছেন। সদ্য গৃহীত বাজেটে এই বিরাটসংখ্যক জনগোষ্ঠীর খাদ্য, নগদ অর্থ ও আত্মকর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও কার্যকর বরাদ্দ নেই। যেটুকু যা বরাদ্দ আছে, তার এক বড় অংশ চুরি, দুর্নীতি, দলবাজি ও জালিয়াতির কারণে মানুষের কাজে আসছে না। মহামারীর সুযোগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুরি, দুর্নীতি আর জালিয়াতিও চরমে উঠেছে।

করোনার পরীক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্র করে অনিয়ম-দুর্নীতি বহুল আলোচিত। কিন্তু এসবের জন্য কাউকে দায়িত্ব নিতে হয়নি, কারও বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তি দিতেও দেখা যায়নি। করোনা দুর্যোগে সরকারি ত্রাণ ও নগদ অর্থ প্রদানের কর্মসূচিও অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে নিমজ্জিত। করোনা মহামারীকে অনেকেই দুর্নীতি ও অবৈধ আয়ের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে। মুনাফাখোর বাজার নিয়ন্ত্রণকারী থেকে শুরু করে গৃহীত মেগা প্রকল্প, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও অনিয়ম, চুরি, দুর্নীতি নতুন মাত্রা নিয়েছে। অতীতেও দেখা গেছে এ দেশে মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে অনেকেই দ্রুত বিশাল মুনাফা, আয় ও সম্পদ গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করেছে। এখনো তার ব্যত্যয় নেই। বস্তুত মহামারী দুর্যোগে সীমাহীন বিপাকে পড়ে লাখ লাখ মানুষ যখন প্রাণ হারায়, কোটি কোটি মানুষ যখন নিঃস্ব থেকে আরও নিঃস্ব হয়, তখন এক শ্রেণির মানুষ নানাভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করে দ্রুত ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তৈরি হয় নতুন বিত্তবান গোষ্ঠী, সুযোগসন্ধানী লুটেরাদের নতুন নতুন অংশ। বিদ্যমান রাষ্ট্র, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কাঠামো কোনো না কোনোভাবে এদের মদদ জোগায়। করোনাকালে বাংলাদেশসহ বেশ কিছু রাষ্ট্রে আমরা আবার এই নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি।

এটা অত্যন্ত স্পষ্ট, অতীত সরকারসমূহের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের কথিত উন্নয়নের রাজনীতি সমাজে সীমাহীন বৈষম্য লাগামহীনভাবে বাড়িয়ে তুলছে। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে; ১৭ কোটি মানুষের দেশকে লুটপাটের এক ধরনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা হয়েছে। আমাদের মহান স্বাধীনতার ঘোষণায় বর্ণিত ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠার বিপরীতে দেশকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চরম কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা যেমন পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত, তেমনি অর্থনৈতিক ক্ষমতাও আজ পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মাফিয়ারাই এখন সর্বেসর্বা। সরকারের মধ্যে তারা আবার নানা সরকার গড়ে তোলে। কখনো কখনো সরকারকেও এরা জিম্মি করে ফেলে।

শোষণ-বঞ্চনা, নির্যাতন-নিপীড়ন, বৈষম্য আর বিভাজনের এ রকম একটি রাষ্ট্রব্যবস্থায় মহামারী দুর্যোগ থেকে উত্তরণ সত্যিই কঠিন। সে কারণে আশঙ্কা যে, আমাদের দুর্ভোগ-দুর্দশাও প্রলম্বিত হবে। কিন্তু দেশের মানুষ তো এটাকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে পারে না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষকে যেমন অস্তিত্ব রক্ষায় ঘুরে দাঁড়াতে হয়, বিদ্যমান দশা থেকে মুক্তি পেতে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া বোধ করি আর কোনো পথ নেই; নিশ্চিতই মানুষ এই পথেই এগিয়ে যাবে; রক্ষা করবে নিজেদের, রক্ষা করবে দেশকে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি


এখানে শেয়ার বোতাম