মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৯

করোনাকালে আমাদের মোটিভেশনাল স্পিকারগণ…

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 25
    Shares

আবু নাসের অনীক::

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন মোটিভেশনাল স্পিকারদের বেশ কদর। আমাদের দেশে সে ধরনের মোটিভেশনাল স্পিকার তেমন না থাকলেও করোনাকালীন সময়ে দেশের মন্ত্রী-সাংসদরা এক এক জন মোটিভেশনাল স্পিকার হয়ে উঠেছেন। তাদের মোটিভেশনমূলক বক্তব্যে জনগণ ব্যাপকভাবে উদ্দীপ্ত! নেতাদের মোটিভেশনাল বক্তব্যর কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করছি-

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘করোনাভাইরাস নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আমাদের পর্যাপ্ত সক্ষমতা রয়েছে এবং আমরা যথাযথ ব্যবস্থা করবো’ (৮ মার্চ ২০২০)।

মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপরোক্ত বক্তব্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বলেন,‘করোনা মারাত্বক রোগ নয়; এটা সর্দি-জ্বরের মতো’(১২ মার্চ ২০২০)।

মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন,‘ করোনা প্রতিরোধে ঢাকা বিমানবন্দরের মত ব্যবস্থা উন্নত দেশগুলোতেও নেই’(১৪ মার্চ ২০২০)

সাংসদ শামীম ওসমান বলেন,‘শেখ হাসিনা আল্লাহওয়ালা মানুষ, করোনা কিছুই করবে না’(১৪ মার্চ ২০২০)

মাননীয় তথ্যমন্ত্রী বলেন,‘করোনাভাইরাস সরকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে’(১৮ মার্চ ২০২০)।

মাননীয় সেতু মন্ত্রী বলেন,‘করোনাভাইরাস এমন কোন শত্রু শক্তি নয়, যাকে পরাজিত করা যাবে না। আমরা করোনাভাইরাসের চেয়ে শক্তিশালী’(২১ মার্চ ২০২০)।

মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন,‘করোনা নিয়ন্ত্রণে আমেরিকা, ইতালীর চেয়েও বেশি সফল বাংলাদেশ’(২৩ এপ্রিল ২০২০)।

এখানে কিছু নমুনা দিলাম মাত্র। গত চার মাসে তারা এ ধরনের অসংখ্য বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। যে বক্তব্যের সাথে বাস্তবতার নুন্যতম মিল নেই। এই সমস্ত তথাকথিত মোটিভেশনাল বক্তব্য শুনে আমাদের দেশের জনগণ ব্যাপকভাবে মোটিভেটেড হয়েছেন! তারা এতোটাই মোটিভেটেড হয়েছেন যে, সরকার পরবর্তীতে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে বলতে বলতে গলা ফাটিয়ে ফেললেও তারা নুন্যতম স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না।

সরকার প্রধান থেকে শুরু করে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী সাংসদরা যখন কোন বক্তব্য প্রদান করেন, তখন আমজনতার উপর এমনিতেই সেই বক্তব্যের প্রভাব পড়ে। সংক্রমণের প্রথম মাসেই তাঁরা সকলেই ধারাবাহিকভাবে করোনা বিষয়ে বালখিল্য বক্তব্য দিয়েছেন। কোন প্রকার প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি না থাকা সত্বেও বোঝাতে চেয়েছেন তারা প্রস্তুত। স্বাভাবিকভাবেই জনগণ প্রথম থেকেই বিষয়টিকে হালকা হিসেবে নিয়েছে এবং তার মধ্যে একটা বেপরোয়াভাব গড়ে উঠেছে।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যেভাবে বিষয়গুলো চিন্তা করেন তাদের বক্তব্যেও সেই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। অর্থাৎ তাঁরা প্রথম থেকেই বিষয়টিকে যেভাবে এড্রেস করা প্রয়োজন ছিলো সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং ধারাবাহিকভাবে সেই চিন্তাটাই ধরে রেখেছেন। যা তাদের এ পর্যন্ত গৃহীত সকল পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণিত। একের পর এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতিতে সংক্রমণের বিস্তার ও মৃত্যু তাদের মার্চ মাসের চিন্তার প্রতিফলন। যদি তাঁরা মার্চেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করতেন তবে সংক্রমণের বিস্তার আরো আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিলো। পৃথিবীর অন্য দেশ গুলোর সামনে কোন ধরনের অভিজ্ঞতা না থাকলেও আমাদের সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়েছিলো।

বর্তমানে ঠিক যে সময়টিতে টেস্ট বাড়াবার প্রয়োজন সেই মুহুর্তে পরিকল্পিতভাবে টেস্ট কমিয়ে আনা হয়েছে। গত ৩০ জুন নমুনা পরীক্ষা করা হয় ১৮ হাজার ৪২৬। তখন ল্যাবের সংখ্যা ছিলো ৬৮ টি। বর্তমানে ল্যবের সংখ্যা ৭৭ টি। এখন টেস্ট হচ্ছে সেই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। টেস্ট যাতে কমে আসে এর একটি পদক্ষেপ ছিলো ফি নির্ধারণ। তখনই বলা হয়েছিলো এ কারণে উল্লেখযোগ্য হারে পরীক্ষা কমে যাবে। সেটির প্রভাব বর্তমানে দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা: নজরুল ইসলাম বলেন,‘করোনা পরীক্ষার জন্য ২০০ টাকা ফি নেওয়া অযৌক্তিক এবং অনুচিত। লাইনে দাঁড়িয়ে, নানা অভিযোগ থাকা সত্বেও অনেকে পরীক্ষা করাতো। তারা আর করাবেনা। এর ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েকগুন বেড়ে গেলো। পরীক্ষা বাড়ানো উচিত, উল্টো কমে গেল’। পরীক্ষা যাতে কমিয়ে আনা যায় এজন্য তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে সমস্ত রোগীর একসাথে চারটি লক্ষণ থাকবেনা তাদের টেস্ট করা হবে না। অথচ আমরা জানি, বর্তমানে সংক্রমিত মানুষের একটি বড় অংশ উপসর্গহীন। এবং যাদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি কাজ করে। এ সকল পদক্ষেপের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে পরিকল্পিতভাবে টেস্ট কমিয়ে আনা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কিট সংকট, করোনা রোগীদের ১৪ দিন পর দ্বিতীয়বার পরীক্ষা না করার কারণে পরীক্ষার সংখ্যা কমেছে। কার্যত এটি সঠিক তথ্য নয়। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ৫ লাখের বেশি কিট এনেছে। কিন্তু সরকার এগুলো রিসিভ করতে সময় ক্ষেপণ করছে (৮ জুন ডেইলি ষ্টার)। মূলত সংক্রমণের সংখ্যা কম দেখিয়ে একটি আর্টিফিসিয়াল পরিসংখ্যান তৈরি করতে চাইছে। যাতে তারা বলতে পারে সংক্রমণ কম ঘটছে ধারাবাহিকভাবে। অর্থাৎ গতি নিম্নমুখী এবং চুড়ান্ত সীমা অতিক্রম করে গেছে। যেহেতু চুড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে ফলশ্রুতিতে টেস্টও বাড়াবার প্রয়োজনীয়তা নেই। ঠিক এমন একটি লজিক দাঁড় করাবার ব্যর্থ চেষ্টা।

একদিকে সংক্রমণের সংখ্যা কম দেখানো অন্যদিকে সুস্থতার সংখ্যা যেনতেন প্রকারে বেশি দেখানো তাদের প্রধান লক্ষ। কিন্তু গত দুই দিন সংক্রমণের হার ছিলো ২৪ শতাংশ, আজকে যেটা বেড়ে হয়েছে ২৫ শতাংশ। টেস্ট কমিয়ে সনাক্তের সংখ্যা মেকানিজম করা সম্ভব হলেও সংক্রমণের হার মেকানিজম করে কমানো সম্ভব নয়। বর্তমানে সংক্রমণের যে হার দেখাচ্ছে সেটি খুবই উদ্বেগজনক। এটা নির্দেশ করে আমরা উচ্চ হারে সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে প্রবেশ করেছি। এই সময়টিতে সর্বোচ্চ টেস্ট করা প্রয়োজন সেই সময়ে টেস্টের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে অনেক গুলো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করবে। সেই সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের লজিক তৈরি করার জন্যই এসব আয়োজন। যাতে আপনি সমালোচনা করলেই সরকার পাল্টা লজিক দাঁড় করাতে পারে।

গত মাসের শেষের দিকে রোগীদের সুস্থতা বিবেচনার জন্য ১৪ দিন পর দ্বিতীয় টেস্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সরকারী পর্যায়ে। অধিদপ্তর বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আপডেট আইসোলেশন ডিসচার্জ গাইডলাইন অনুসারে তারা এটা করছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি বিশেষ প্রেক্ষিতে এটি আপডেট করেছে এক প্রকার বাধ্য হয়ে। সেই বিশেষ প্রেক্ষিত গুলোর মধ্যে রয়েছে কিটের সংকট, পরীক্ষাগারের স্বল্পতা, হাসপাতালে সিটের স্বল্পতা, অক্সিজেনের স্বল্পতা এ ধরনের আরো কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে। কিন্তু তারা এটা উল্লেখ করেছে, এই পদ্ধতিতে ডিসচার্জ করা ঝুঁকিপূর্ণ এটা বিবেচনা করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আপডেট ডিসচার্জ গাইডলাইন এর ঝুঁকি সম্পর্কে বলছে,‘There is a minimal residual risk that transmission could occur with these non–test-based criteria. There can be situations in which a minimal residual risk is unacceptable, for example, in individuals at high risk of transmitting the virus to vulnerable groups or those in high-risk situations or environments.’(Criteria for releasing COVID-19 patient from isolation-WHO)

ঝুঁকি বিবেচনায় তারা বিভিন্ন দেশকে পরামর্শ প্রদান এবং উৎসাহিত করছে আগের পদ্ধতিতে রোগী ডিসচার্জ করা অনেক বেশি গ্রহণীয়। অনেক দেশ তাদের পূর্ববর্তী নির্দেশনা অনুসরণ করলেও বাংলাদেশ নতুন গাইডলাইন অনুসরন করছে। যেহেতু এই পদ্ধতিতে অতি দ্রুত যেনতেন প্রকারে সুস্থতার সংখ্যা বৃদ্ধি করে একটি আর্টিফিসিয়াল পরিসংখ্যান দাঁড় করাতে পারে। আগের গাইডলাইনের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে,‘For situations that might still require a laboratory-based approach, we encourage the further optimization of such a laboratory algorithm. WHO encourages countries to continue testing patients, if they have the capacity to do so, for systematic data collection that will enhance understanding and better guide decisions about infection prevention and control measures, especially among patients with prolonged illness or those who are immunocompromised.’(Criteria for releasing COVID-19 patient from isolation-WHO)

কার্যত দেশে বর্তমানে সংক্রমণ প্রতিরোধে যে তৎপরতা রয়েছে সেটা খুবই সীমিত আকারে এবং খন্ডিত। সংক্রমণের হার যে জায়গায় পৌঁছেছে এতে বেশি বেশি টেস্ট, কন্টাক্ট ট্রেসিং, কোয়ারেন্টাইন আর আইসোলেশনের কোন বিকল্প নেই। ইতিমধ্যে টেস্ট কমিয়েছে আর এপ্রিল মাসের পর থেকে কার্যত কন্টাক্ট ট্রেসিং বিষয়ে কোন কাজই হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্যবিদ মুজাহেরুল হক বলেন,‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ কন্টাক্ট ট্রেসিং। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অবহেলা করে চলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর’।

গত একমাস ধরে লকডাউনের নানা ধরনের পরিকল্পনা করে পূর্বরাজাবাজার পরীক্ষামূলক করে ব্যর্থ হবার পরেও একই পদ্ধতিতে ওয়ারীর একটি অংশে লকডাউন চলছে, কার্যত সেটি কোন কাজে লাগবে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্যবিদ অধাপক ডা: নজরুল ইসলাম বলেন,‘সরকার এখন পর্যন্ত এমন কোন ব্যবস্থা নেয়নি, যাতে করোনার সংক্রমণ কমতে পারে। সংক্রমণের ভিত্তিতে এলাকা চিহ্নিত করা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম খুবই সীমিত জায়গায় হয়েছে। এই কাজ ভালোভাবে করা গেলে সংক্রমণ কমত’।

কিন্তু আমাদের সরকার এর আশপাশ দিয়েও হাটছে না। বর্তমানে তাদের ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে দেশে যে মহামারি চলছে এটা শুধু কাগজের পাতায়। প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে, এর কোন কিছুই সরকারকে স্পর্শ করছে না। অথচ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মোট রোগীর হিসাবে বিশ্বে ১৭ তম এবং সক্রিয় রোগীর হিসাবের তালিকায় ৭ নম্বরে উঠে এসেছে দেশ (ওয়ার্ল্ডোমিটার)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে,‘যেসব দেশ ব্যপক ভিত্তিক ও সুসংহত পদ্ধতি অনুসরন করছে, তারা স্থানীয় ভিত্তিতে সংক্রমণের বিস্তার ঘটলেও তা নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে এবং ব্যাপকভিত্তিক পুণঃসংক্রমণ এড়াতে পারবে। তবে যেসব দেশ তাদের সব হাতিয়ার প্রয়োগ করছে না এবং টুকরো টুকরো ব্যবস্থার পদ্ধতি অনুসরন করছে, তাদের দীর্ঘ কঠিন পথ অতিক্রম করতে হবে’। আমাদের সরকারের কাছে এই দীর্ঘ পথটিই পছন্দের!! যে পথে হেঁটে সে হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে তার সফলতা অর্জন করবে।

হে মাননীয় মোটিভেশনাল স্পিকারগণ, আপনাদের নিজেদের মোটিভেশন ভিষনভাবে প্রয়োজন। আগে নিজেরা মোটিভেটেড হোন তারপর বক্তব্য দিন, এতে দেশ জাতীর মঙ্গল বৈ অমঙ্গল হবে না! নতুবা সামনে শুধুই অমঙ্গলের ঘনঘটা।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 25
    Shares