মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৪

কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ এর ১ম মৃত্যুবার্ষিকী

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক:: আজ ২৯ মে। এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন-সংগ্রামের অকুতোভয় সংগ্রামী নেতা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডিয়াম মেম্বার কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ এর ১ম মৃত্যুবার্ষিকী।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সংগ্রামী সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডিয়াম মেম্বার জননেতা কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ মৌলভীবাজার জেলাধীন কমলগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে ১৯৫৪ সালের ১১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ মনোয়ার আলী এবং মা সৈয়দা আমিরুন্নেসা খাতুন।

সৈয়দ আবু জাফর ১৯৬৯ সালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার পর ঢাকা সিটি ল কলেজে পড়ালেখা করেন। পরে তিনি উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য ১৯৭৯ সালে জার্মানি যান। ছাত্রজীবনে প্রগতিশীল ছাত্রগণসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রগতিশীল সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন। নারী, শিশু-কিশোর ও পেশাজীবিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিলো। ১৯৭০ সালে তিনি কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। মৌলভীবাজার জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে এ দুই সংগঠনেরই সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সিলেটে চা শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯৭২ সালে তিনি প্রথম কারাবরণ করেন। ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রতিবাদ করায় আবারো তিনি গ্রেপ্তার হন এবং বিনাবিচারে দীর্ঘ এক বছর কারাজীবন ভোগ করেন। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও তাঁর বিশাল ভূমিকা ছিলো। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের উত্তাল আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর আপোষহীন সোচ্চার ভূমিকার জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার-নির্যাতনের শিকার হন। ক্ষেতমজুর আন্দোলনেও তাঁর অগ্রণী ও দৃঢ় ভূমিকা ছিলো। যার ফলশ্রুতিতে ক্ষেতমজুর সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব তাঁকে পালন করতে হয়েছে। অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনেও তাঁর ছিল সমান পদচারণা। ছাত্রজীবন থেকেই কমরেড জাফর সাংবাদিকতার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৯০ সাল থেকে মৌলভীবাজারের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক মনুবার্তার সম্পাদক-প্রকাশক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি গরিব মানুষ তথা গণমানুষের শোষণমুক্তির লক্ষ্যে আজীবন আদর্শবাদি কমরেড আবু জাফর কাজ করে গেছেন অক্লান্তভাবে দৃঢ়তা ও দক্ষতার সাথে বিপুল সাহসিকতায়। বর্তমান দুঃসময়ে এমন রাজনৈতিক উদাহরণ খুব কমই পাওয়া যায়।

গরিবের বন্ধু কমরেড জাফর তাত্ত্বিকভাবেও ছিলেন খুবই সমৃদ্ধ। তবে শুধু তাত্ত্বিকভাবেই নয়, তত্ত্বের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ফিল্ড ওয়ার্কেও তিনি ছিলেন দক্ষ। নিয়মিত রাজনৈতিক পড়াশোনার সাথে সাথে প্রচুর লেখালেখিও করেছেন। পার্টিকর্মি ও সাধারণ মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিলো খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ। অতি অল্প সময়ে যে-কাউকে হাসিমুখে আপন করে নিতে পারতেন। নবাগত কর্মিদেরকে দীর্ঘ সময় নিয়ে ধৈর্যের সাথে আলাপ-আলোচনা করে আদর্শিক শিক্ষার মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করে পার্টিতে রিক্রুট করতেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। যে জন্য তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের আস্থা ও নির্ভরতার স্থান দখল করতে পেরেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন একজন সত্যিকারের সাম্যবাদী জননেতা।

পার্টির তাত্ত্বিক প্রশিক্ষক হিসেবেও কমরেড জাফর ছিলেন অগ্রগণ্য। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ব্যাপারেও তাঁর অভিজ্ঞতার কমতি ছিল না। এ ব্যাপারে সর্বদা সচেতন থাকতেন ও গবেষণা করতেন। অন্যান্য দেশের বাম-কমিউনিস্ট নেতাদের সাথেও ছিলো তাঁর গভীর ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি-প্রকৃতি, অতিত ও বর্তমান বিশ্লেষণ করে পার্টির কর্মকৌশল নির্ধারণেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। আদর্শের প্রশ্নে তিনি কোনোদিন আপোষ করেননি, মাথা নত করেননি। নব্বই এর দশকে অসৎ সুবিধাবাদি বিশ্বাসঘাতকদের পার্টিকে বিলোপ করার কুচক্রান্তকে রুখে দিয়ে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে পার্টিকে রক্ষা করতে অসামান্য অবদান রাখেন কমরেড আবু জাফর। তাঁর এ অবদানের কথা কোনোদিন ভুলে যাবার নয়। নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্টদেরকে তাঁর সুবিশাল আদর্শিক কর্মকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যেতে হবে সমাজবিপ্লবের সুনির্দিষ্ঠ লক্ষ্যে।

২০১৯ সালের ২৯ মে জননেতা কমরেড সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ তাঁর সুবিশাল কর্মময় সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটিয়ে বড়ো অসময়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

(সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ: জন্মঃ ১১ জুলাই ১৯৫৪ — মৃত্যুঃ ২৯ মে ২০১৯)


এখানে শেয়ার বোতাম