বুধবার ‚ ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ‚ ১২ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ‚ সকাল ৬:১৭

Home বিপ্লবীদের কথা বিপ্লবের মহান শিক্ষক কমরেড চারু মজুমদার লাল সালাম

বিপ্লবের মহান শিক্ষক কমরেড চারু মজুমদার লাল সালাম

মনজুরুল হক ::


ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট রাজনীতি তথা উপমহাদেশের কমিউনিস্ট রাজনীতির খোল-নলচে বদলে নতুন এক সূর্যকিরণের জন্ম দেওয়া কমরেড চারু মজুমদারের শহীদ দিবস আজ ২৮ শে জুলাই। ১৯৭২ সালের এই দিনে তার মৃত্যু হয়। ধরা পড়ার মাত্র এগার দিনের মাথায়। তাঁর মৃত্যু আজ আর রহস্যাবৃত্ত নয়। তাঁকে ঠান্ডা মাথায় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ বন্ধ করে দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। যে মানুষটির কার্ডিয়াক অ্যাজমায় প্রায়শই মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হোত। অক্সিজেন সিলিন্ডার ও পেথিড্রিন ইঞ্জেকশনসহ দু:সহ আন্ডারগ্রাউন্ড জীবন কাটিয়েছেন ৩টি বছর। তাঁকে ‘দুবেলা হার্ট স্পেশালিস্ট দেখে যাচ্ছেন’ বলে মিডিয়ার কাছে নির্জলা মিথ্যে বলা শাসক শ্রেণির চাকরেরা কার্যত ঠান্ডা মাথায় তাকে হত্যা করেছিল।

সেই হত্যাকাণ্ড বা ‘মৃত্যু’ নিয়ে নিয়ে অসংখ্য বই-পত্তর বেরিয়েছে। নানা মুনির নানা মতও প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব ইন্সপেক্টর রুণু গুহ নিয়োগীও পরে চারু মজুমদারকে গ্রেপ্তার করার ‘কৃতিত্ব’ নিয়ে “সাদা আমি কালো আমি” নামে বই বার করেছেন। দার্জিলিং মেইল ধরতে যাওয়া ‘ক্যুরিয়ার’ ছেলেটাকে অনেক দিন ধরে ফলো করে শেষে গ্রেপ্তার করেই চারু মজুমদারের সকল তথ্য পায় পুলিশ। আর সেই ক্যুরিয়ারকে ধরার খবর পায় দীপক বিশ্বাসের বিশ্বাসঘতকতায়। রুণুর বইতে বলা হয়েছে- ‘এমনিতেই তিনি অসুস্থ্য ছিলেন, তার উপর তার সব শক্তিশালী পার্টি সদস্যরা আমাদের কব্জায় জেনে তিনি মানসিকভাবে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলেন। তার ওপর পেথিড্রিন ইনজেকশন বন্ধ করে দেওয়া এবং প্রচণ্ড জেরার চাপে তিনি ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন…তার ওপর….’!

এতবড় মাপের মানুষ , যিনি একটা ঐতিহাসিক সময়কে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তাঁকে সামগ্রিক উপলব্ধি নিয়ে অনুধাবন করতে গেলে যে দক্ষতা ও সময় প্রয়োজন ছিল তা আমাদের নেই। তবে আশা এইটুকু যে, মুক্ত ভারতের তথা মুক্ত উপমহাদেশের যে স্বপ্ন তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেছিলেন তাকে সফল করতে হলে অনেক কাজের মধ্যে চারু মজুমদারকে উপলব্ধির স্তরকে উন্নত করাটাও একটা কাজ, আশার কথা এই বোধ ক্রমশঃ সঞ্চারিত হচ্ছে। আর তাঁকে জানা মানেই তাঁর দুর্দমনীয় স্পিরিট ও প্রাসঙ্গিকতা বোঝা।

তাঁকে ধরিয়ে দেবার জন্য ১০,০০০ টাকা পুরষ্কার ঘোষণা করেছিল সিদ্ধার্থবাবুর সরকার। একই অঙ্ক ঘোষণা করেছিল অন্ধ্র, বিহার উড়িষ্যার সরকারও। যেদিন পুলিশ হানা দিয়ে তাঁকে ধরে তারপর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ কমিশনার ফোনে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থবাবুকে জানান। সিদ্ধার্থবাবু হান্টিং কলে দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীকে জানান। আকাশবাণীর প্রতিটি কেন্দ্রে খবর ঘোষণা করা হয়। সেই মানুষটা আজ আর নেই। চারু মজুমদারকে গ্রেপ্তারের সময় আর দু‘জন যাঁরা ছিলেন তারা শ্লোগান দিয়ে কালো ভ্যানের সামনে অত রাতে জমায়েত লোকের সামনে বলে ওঠেন, ‘কমরেডস, আমাদের সঙ্গে এই বয়স্ক মানুষটাই হলেন চারু মজুমদার। পুলিশ এঁকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।’ সমস্ত জনতাই পলকের জন্য থমকে উঠলো। নকশালবাড়ির সুবাদে এই নামের সঙ্গে পরিচিত সবাই। তাঁকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক রোমান্টিক নেতার চরিত্র। একজন বয়স্কা মহিলা বলে উঠলেন, ‘আহা, এমন একজন মানুষ আমাদের পাড়ায় ছিলেন! আগে জানলে একটু চোখের দেখা দেখে নিতাম।’

‘কিপ এলারর্ট। চারু মজুমদারে ইজ ডেড। উই মাস্ট বি অন দ্য অফনেসিভ।’ অয়্যারলেসের মাধ্যমে গোটা পশ্চিম বাংলার থানায় ঘন ঘন মেজেস ছড়িয়ে যেতে থাকে।

গ্রেপ্তার হবার মাত্র বারো দিনের মাথায় মারা গেলেন। ওদের এতটুকু সাহস হলো না তাঁকে রেখে বিচারের প্রহসনটুকু করার। কেন এত ভয়? কড়া পুলিশ প্রহরায় মৃতদেহ দাহ করা হলো বৈদ্যুতিক চুল্লীতে অতি গোপনে। কোন সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যানকে পর্যন্ত যেতে দেওয়া হয়নি তাঁর কাছে। পুলিশের কাছে কাদের যেন কঠোর নির্দেশ, কোন প্রশ্ন করা চলবে না। শুধু সমস্ত মন্ত্রী ও নেতাদের বাড়ীর সামনে গিজ গিজ করছিল পুলিশ আর পুলিশ তাঁর মৃত্যুর পর।

১৯৯৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর অ্যাসোসিয়েশন অব প্রোটেকশন অব ডেমোক্র্যাটিক রাইটস-এর কার্যকরী কমিটির সদস্য সুজাত ভদ্র ও প্রয়াত চারু মজুদারের ছেলে অভিজিৎ মজুমদার কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলপা দায়ের করেন [ডব্লু পি নং ১৭১৪১ ডব্লু ১৯৯৮] ভারতীয় সুবিধানের ২২৬ ধারা বলে তারা অভিযোগ করলেন যে ১৯৬৮-১৯৭২ এর মধ্যে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন নকশালবাড়ির সমর্থকদের এবং সেই আন্দোলনের নেতাদের সমস্ত রকম মানবিক অধিকার ও সং২বিধানের মৌলিক অধিকার অগ্রাহ্য করে নির্বিচারে হত্যা করেছে। একই সঙ্গে আরও দুটি অধিকারও লঙ্ঘিত হয়েছে- ১. ইন্টারন্যাশনাল কনভেন্ট অব সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস-১৯৬৬ ও ২. ইউনভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস ১৯৪৮ (এবং জলার্ক, চারু মজুমদার সংখ্যা-১, ২০০৯) যে মামলার কোনও খবর আজ আর কারও কাছে নেই!

নকশালবাড়ি সাম্প্রতিক ভারতবর্ষের ইতিহাসের সর্বশেষ বিভাজন–রেখা। এদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ–সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপনও নকশালবাড়ির কৃষক–অভ্যুত্থানের আগে যেমনটি ছিল পরে আর তেমনটি থাকেনি। দেশব্যাপী সেই নিপীড়িত জনতার বিপুল অভ্যুত্থানে ত্রুটি বিচ্যুতি কতটা ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে, ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা আজও নকশালপন্থীরা দখল করতে পারেনি এটাও বাস্তবতা। কিন্তু ১৯৬৭তে তরাইয়ের আকাশে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ যে ভারতবর্ষের আবহমানকালের ইতিহাসের এক অভিনব পালাবদলের নির্ঘোষ নিনাদ করেছিল তা আজ অমোচনীয় সত্য এবং শত্রু-মিত্রনির্বিশেষে সকলেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। সমাজগবেষকরা আজ নানাভাবে সমীক্ষা করে দেখেছেন ভারতবর্ষের জনজীবনের সর্বক্ষেত্রে নকশালবাড়ির অগ্নিস্ফূলিঙ্গ একেবারে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। এমনকি শাসকশ্রেণীগুলির আদবকায়দাও সে বদলে দিয়েছে।

চারু মজুমদার আজ নেই। কিন্তু তিনি ভারতবর্ষের শোষিত জনগণের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন শোষণমুক্তির এক অমোঘ অস্ত্র মার্কসবাদ–লেনিনবাদ–মাওসেতুঙ চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত নকশালবাড়ির রাজনীতি (যাকে এখন সিপিআই (মাওবাদী)মার্কসবাদ–লেনিনবাদ–মাওবাদ বলে। সেই রাজনীতি দিয়ে যেদিন সমগ্র ভারতবর্ষকে মুক্ত করা যাবে সেদিনই কমরেড চারু মজুমদারের আত্মত্যাগকে প্রকৃত সন্মান জানানো হবে।

নক্সালবাড়ি আর চারু মজুমদার এক নয়। চারু মজুমদারের উজ্জ্বলতায় নক্সালবাড়ি উজ্জ্বল। সূর্যের আলোয় যেমন করে চাঁদ আলোকিত হয়। আর তাই, নক্সালবাড়ির শিক্ষা বলতে চারু মজুমদারের শিক্ষাকেই বুঝতে হবে। চারু মজুমদারকে বাদ দিয়ে , অমান্য করে, কিংবা খণ্ডন করে ‘নক্সালবাড়ি আন্দোলন’ পালন করার অভিসন্ধির মধ্যে স্পষ্ট প্রতারণা রয়েছে। যেটা ভারতে যেমন হয়েছে, এপারে বাংলাদেশেও হয়েছে এবং হচ্ছে!
নক্সালবাড়ির আন্দোলন টুপ করে গাছ থেকে পড়েনি। কয়েকজন বিপ্লবাকাঙ্খী একরোখা মানুষের ঐকান্তিক চেষ্টা, ধনুর্ভঙ্গ পণ থেকে নিঃশর্ত আত্মত্যাগ দিয়ে তিলে তিলে নক্সালবাড়ির কর্ষিত জমিনে মুক্তির বীজ রোপিত হয়েছে।

বাংলাদেশে যারা নকশালপন্থী আদর্শের পার্টি করতেন তারা ‘ক্রসফায়ার’সহ ত্রিমুখি আক্রমণে পর্যুদস্তু হয়ে প্রায় ছত্রভঙ্গ। নানা ভাগে, নানা ফ্যাকশনে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে এখন আর প্রশাসন বা শাসকশ্রেণিকে চ্যালেঞ্জ করার শক্তি রাখে না। এই অবসরে রঙ বেরঙের চারু মজুমদারপন্থী ঝাঁকের কৈ আসর মাতানোর প্রচেষ্টা নিচ্ছে। তারা আজকে চারু মজুমদারকে যে জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছেন তাতে করে আগামী কিছুদিনের মধ্যেই হয়ত দেখা যাবে চারু মজুমদারের নামে ‘পূজো-অর্চনা’ হচ্ছে, মাওবাদ, চারু মজুমদারের শিক্ষা, সশস্ত্র সংগ্রাম, শ্রেণি সংগ্রাম এমন এক ‘গ্যাঁজানো চোলাই’ হয়ে উঠেছে! যারা এই ফ্যাশনবাজী করছেন তারা চারু মজুমদারের মূল নীতি সশস্ত্র সংগ্রামের পধ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছেন, অথচ সামাজিক মাধ্যমে বেশ কলার উঁচু করে বলেন- ‘আমরা মাওবাদী, চারু মজুমদারপন্থী’! অথচ এই ‘ক্রসফায়ার’শাসিত জমানায় তারা প্রশাসন বা পুলিশের চক্ষুশূল হচ্ছে না! অবাক করা ব্যাপার নয়?

বাংলাদেশে প্রকাশ্যে চারু মজুমদার, নক্সালবাড়ি নিয়ে কাজ করা সংগঠন বেশি নেই। যেখানে চারু মজুমদার এবং নক্সালবাড়ি, সেখানে সাধারণভাবেই ধরে নিতে হবে যারা চারু মজুমদারের লাইনকে উর্ধ্বে তুলে ধরেন তারাই নক্সালবাড়ি কৃষি বিপ্লবের লাইনকে উর্ধ্বে তুলে ধরবেন। অথচ এখানে তেমনটি ঘটেনি। যারা ‘নক্সালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান নিয়ে ভক্তি গদগদ অনেকেই চারু মজুমদারকে ‘বিপ্লবের অথোরিটি’মনে করেন না। এটা হল স্রষ্টাকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির গুণকীর্তন করা! তারা যে মতাদর্শগতভাবে চারু মজুমদারের শিক্ষাকে গ্রহণ এবং প্রয়োগ করেন না সেটা তাদের বিভিন্ন বক্তব্য-লেখাজোকা দিয়ে প্রমাণও করা যায়, যদিও তা আবশ্যক নয়।

নকশালবাড়ী বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকবে। কারণ এ যে অজেয় মাকর্সবাদ লেনিনবাদ-মাও সেতুঙ বিচারধারার উপর প্রতিষ্ঠিত। সামনে আছে অনেক বাধা, অনেক বিপত্তি, অনেক বিশ্বাসঘাতকতা, অনেক বিপর্য্যয়, কিন্তু তবু নকশালবাড়ী মরবে না, কারণ চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ-এর শিক্ষার উপমহাদেশীয় নীতি-কৌশল চারু মজুমদার সঙ্গে করে চিতায় নিয়ে যাননি। রেখে গেছেন জনগণের মুক্তির কাজে। নকাশালবাড়ী মরে নি, আর নকশালবাড়ী কোনদিন মরবেও না।

কমরেড চারু মজুমদারও উপমহাদেশের বিপ্লবের অথোরিটি হিসাবে ধ্রুব তারার মত জ্বল জ্বল করতে থাকবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ

শেষ পর্যন্ত কে হচ্ছেন আইসিসি চেয়ারম্যান?

অধিকার ডেস্ক:: ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অভিভাবক সংস্থা আইসিসি এখন পুরোপুরি অভিভাবকহীন। চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর পদত্যাগ করেছেন আরও বেশ কিছুদিন আগে। কিন্তু এরমধ্যে এখনও পর্যন্ত...

থানায় নিয়ে যুবলীগ নেতাকে মারধর, ওসি প্রত্যাহার

অধিকার ডেস্ক:: থানায় নিয়ে এক যুবলীগ নেতাকে বেধড়ক মারধরের ঘটনায় নেত্রকোনার দুর্গাপুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত (ওসি) মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মঙ্গলবার...

সিলেটে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান, জঙ্গি আটক, বোমা উদ্ধার

অধিকার ডেস্ক:: জঙ্গি আস্তানার খোঁজে সিলেটের টিলাগড়ের শাপলাবাগ ও জালালাবাদ আবাসিক এলাকার পৃথক দুটি বাসায় অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুটি বাসায় অভিযান...

রাশিয়ার কাছে ভ্যাকসিন চেয়েছে ২০ দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:: বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়েছে রাশিয়া। ১৯৫৭ সালে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেটির নামের...
Shares