বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৮

কমরেড আবদুল হক’র শততম জন্মবার্ষিকীতে মৌলভীবাজারে আলোচনা সভা

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 93
    Shares

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:: কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা কমরেড আবদুল হক-এর শততম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের লক্ষ্যে কমরেড আবদুল হক-এর ১০০ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি, মৌলভীবাজারের উদ্যোগে ২৩ ডিসেম্বর বুধবার সন্ধ্যায় শহরের চৌমুহনাস্থ (শমসেরনগর রোড) একটি রেস্টুরেন্টের কনফারেন্স রূমে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব উদযাপন কমিটির আহবায়ক শহীদ সাগ্নিককের সভাপতিত্বে সভার শুরুতে মহান এই নেতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

উদযাপন কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনয়িন সংঘ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্রমিকনেতা রজত বিশ্বাসের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সভায় ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক গণসঙ্গীতশিল্পী অমলেশ শর্ম্মার পরিবেশনায় সমবেত কন্ঠে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল গানের মাধ্যমে আলোচনা সভা শুরু হয়।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি নুরুল মোহাইমীন মিল্টন, বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির মৌলভীবাজার জেলা আহবায়ক কৃষকনেতা ডা. অবনী শর্ম্মা, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি মোঃ মোস্তফা কামাল, ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদ মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক গণসঙ্গীতশিল্পী অমলেশ শর্ম্মা ও কোষাধ্যক্ষ মৃগেন চক্রবর্তী, চা-শ্রমিক সংঘের জেলা কমিটির যুগ্ম-আহবায়ক চা-শ্রমিকনেতা হরিনারায়ন হাজরা, মৌলভীবাজার জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সোহেল আহমদ, মৌলভীবাজার জেলা হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহিন মিয়া, সুনামগঞ্জ জেলা বারকি
শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদিও, কৃষকনেতা সিদ্দিকুর রহমান প্রমূখ।

আলোচনা সভায় বক্তারা সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সকল দেশপ্রেমিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে বলেন সমগ্র পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় এক গভীর ও সামগ্রিক সংকট, দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বৃহত্তম ও গভীরতম অর্থনৈতিক সংকট ও মন্দা আঁকাবাঁকা গতিপথে মহামন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। পুঁজি ও শক্তির অনুপাতে বাজার ও প্রভাববলয় পুণর্বন্টনকে কেন্দ্র করে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মুদ্রাযুদ্ধ, স্থানীয় ও আঞ্চলিক যুদ্ধ বিস্তৃত হয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদ বৃদ্ধি করে চলছে। সাম্রাজ্যবাদীরা সংকটের বোঝা বিশ্ব শ্রমিকশ্রেণি, নিপীড়িত জাতি ও জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ায় দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রাম, বিদ্রোহ-বিপ্লব তথা বিশ্ববিপ্লবের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে চলেছে।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে জাতীয় ক্ষেত্রে। বাজার ও প্রভাববলয় পুণর্বন্টন প্রশ্নে আন্তসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে বাংলাদেশসহ এতদাঞ্চলকে নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থল সংযোগ সেতু এবং প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের সংযোগকারী মালাক্কা প্রণালী সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও রণনীতিগত গুরুত্বের প্রেক্ষিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যেমন তার প্রাধান্য অব্যাহত রাখতে চায় তেমনই সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া ও পুঁজিবাদী চীন তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সাম্রাজ্যবাদীরা স্বীয় স্বার্থে বাংলাদেশকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে চায়। সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ ও আমলা-দালাল পুঁজির শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে শাণিত করে সাম্রাজ্যবাদী অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সকল শক্তি ও ব্যক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা। তাহলেই কেবল কমরেড আবদুল হকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদস সম্ভব হবে।

সভায় বক্তারা বলেন, কমরেড আবদুল হক উপমহাদেশ তথা এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে শুধু একটি নামই নয় বরং তিনি হচ্ছেন এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এক অগ্রসেনানী, মহান দৃষ্টান্তস্থাপনকারী এক উজ্জল নক্ষত্র। ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ-গর্বাচেভ, তিনবিশ্ব তত্ত্ব, মাও সেতুং চিন্তাধারা ও মাওবাদ মার্কা সংশোধনবাদসহ সকল রূপের সংশোধনবাদ-সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ প্রতিষ্ঠায় কমরেড আবদুল হক অনন্য ভূমিকা পালন করেন। কমরেড আবদুল হক ১৯২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর যশোর জেলার সদর থানার খড়কিতে এক সম্ভ্রান্ত সামন্ত পীর পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। অথচ সেই সামন্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই তিনি লড়াইয়ে নেমেছিলেন। সামন্তবাদী পীর পরিবার থেকে আগত হলেও তিনি যখন কলকাতায় পড়াশুনা করতেন সেই ছাত্রাবস্থায় তিনি ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং শ্রমিক এবং শ্রমিকশ্রেণীর মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বৈপ্লবিক কর্মকান্ড শুরু করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে বি.এ অনার্স পড়ার সময় তিনি ১৯৪১ সালে ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রার্থী সভ্যপদ লাভ করেন। ১৯৪১ সালেই যশোর জেলার বনগাঁয়ে তৃতীয় কৃষক সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই সম্মেলনে “লাঙ্গল যার জমি তার” এবং ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পাকিন্তান আমলে তিনি ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পুর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশের সময়কালে তিনি ১৯৩৯ সালে হলওয়ের মনুমেন্ট ভাঙ্গার আন্দোলন, ১৯৪২ সালে দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ আন্দোলন, হাটের তোলা আদায় বন্ধ আন্দোলন, ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলে খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলন, বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনসহ ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলন ও গণঅভ্যূত্থান, ১৯৭১ এ যুদ্ধ ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশের বিপ্লবী আন্দোলন ইত্যাদি। এই সাম্রগ্রিক সময়কালে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে অগ্রণী বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, কমিউিনিষ্ট আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি সংশোধনবাদের সকল প্রকাশের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম চালিয়ে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের লাল পতাকা সমুন্নত রেখেছেন। ক্রুশ্চেভ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তিনি প্রথম থেকেই আদর্শগত সংগ্রাম চালান। সংশোধনবাদী ক্রুশ্চেভ-ব্রেজনেভ চক্রের বিরুদ্ধে এই আদর্শগত সংগ্রামের সঠিকতা আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট। ‘সমাজতন্ত্র ব্যর্থ’ সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলদের এই প্রচার অভিযানের ঝড় যখন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের কালজয়ী ভাবাদর্শ উৎপাটিত করতে প্রবাহিত তখন কমরেড আবদুল হক একজন দৃঢ় মাকর্সবাদী-লেনিনবাদীর মত অটল অবিচল ছিলেন। তিনি ছিলেন বিপ্লবী আশাবাদ ও তৎপরতায় উজ্জল। কমরেড আবদুল হক ছিলেন সুবক্তা। তাঁর উদ্দীপক বক্তৃতা প্রতিটি জনসভাকে উদ্দীপ্ত করত। ১৯৭০সালের ২০ জানুয়ারী আসাদ দিবসে ভাসানী ন্যাপ আয়োজিত ঢাকার পল্টন ময়দানে লক্ষাধিক লোকের জনসভায় তাঁর অসাধারণ বক্তৃতা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। সম্ভবত এটাই ছিল তাঁর জীবনে প্রকাশ্যে শেষ জনসভা।

আরও পড়ুন : কমরেড আবদুল হক মনে করতেন ‘ইতহাসের রায় সমাজতন্ত্র’

আলোচনা সভায় বক্তারা জানান, লেখক হিসেবে কমরেড আবদুল হক ক্ষুরধার লেখনির অধিকারী ছিলেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দশ। । ১. ইতিহাসের রায় সমাজতন্ত্র, ২. ক্ষুধা হইতে মুক্তির পথ, ৩. যত রক্ত তত ডলার, ৪. পূর্ব বাংলা আধাউপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী, ৫. কৃষি ব্যবস্থা আধাসামন্ততান্ত্রিক, ৬. মার্কসীয় দর্শন, ৭. সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ-১, ৮.সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের স্বরূপ-২, ৯. বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনীতি ও ১০. মাওসেতুং এর মূল্যায়ন। এই দশটি গ্রন্থের সমন্বয়ে কমরেড আবদুল হক গ্রন্থাবলী পুণপ্রকাশ হচ্ছে। এছাড়াও কমরেড আবদুল হক-এর ১০০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটির উদ্যোগে ঢাকা হতে একটির স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সুদীর্ঘ ষাট বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে পঁচিশ বছরই তাকে আত্মগোপনে কাটাতে হয়। ২২ ডিসেম্বর ১৯৯৫ শুক্রবার রাত ১০টা ৫ মিনিটে বার্ধক্যজনিত অসুস্থ্যতায় ৭৫ বছর বয়সে আত্মগোপনে থেকে কমরেড আবদুল হক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 93
    Shares