বুধবার, জানুয়ারি ২০

এঙ্গেলস-এর দ্বিশত জন্মবার্ষিকী: মার্কসবাদের প্রচারে এঙ্গেলস

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 16
    Shares

মনির তালুকদার:: 

(কমিউনিজমের অন্যতম প্রবক্তা ও আন্তর্জাতিক প্রলেতারিয়েতের মহান নেতা ফ্রেডরিক এঙ্গেলস-এর জন্মদিন ২৮ নভেম্বর। ১৮২০ সালের এই দিনে তিনি জন্মেছিলেন। এ বছর তার দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী। মহান এই দার্শনিকের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এ লেখাটি সাপ্তাহিক একতা’র আর্কাইভ থেকে অধিকারের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হল।)

১৮৪৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক সপ্তাহ করে ফারাকে তিনটি সভা ডাকা হয় জার্মানির এলাবারফেল্ডে। ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২২ ফেব্রুয়ারি। সভার প্রথমটিতে ৪০ জন হাজির হয়েছিলেন। পরেরটিতে ১৩০ জন আর শেষটিতে ২০০ জন। বক্তা ছিলেন ফ্রেডরিক এঙ্গেলস। তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিল কমিউনিজম। এঙ্গেলস ছাড়াও সেই সভাগুলিতে বক্তৃতা করেছিলেন সে সময়ের জার্মানির শিল্পী ও কবি গুস্তভ কোটনেস। এঙ্গেলস তাঁর বক্তৃতার একদিকে যেমন ইউটোপিয়ানদের পুঁজিবাদকে সমালোচনায় উল্লেখ করেছেন পাশাপাশি নিজের অভিমত, অভিজ্ঞতা ও ব্যাখ্যাও পেশ করেছেন। জার্মানির তৎকালীন পরিস্থিতিকে ছবির মতো করে তুলে ধরে দেখিয়েছেন বুর্জোয়া সমাজের সংকট কোথায়।

সহজ সরলভাবে এঙ্গেলস তাঁর ভাষণে মুক্ত অর্থনীতিকে ছন্নছাড়া অর্থনীতি বলে দেখিয়েছেন। ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার জন্যে সবার সাথে সবার লড়াইকেও তিনি বুঝিয়ে দিতে ছাড়েননি। কমিউনিজমের প্রতি মানুষকে টানার জন্যে এঙ্গেলস তাঁর বক্তৃতায় কঠিন তত্ত্বের অবতারণা না করে পরিষ্কার করে বলেছেন, পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবী ফল হলো কয়েকজনের হাতে সম্পত্তির মালিকানা, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব। উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে বিশাল ফারাক আর মানবসম্পদ এবং বস্তুসম্পদের অপচয়।

এঙ্গেলসের এই ধারালো বক্তৃতায় মানুষের মন যেমন টানছিল তেমনই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল কর্তৃপক্ষ। তারা বক্তাদের সতর্ক করে দিল, না থামলেই গ্রেপ্তার করবো, বিচার হবে। বন্ধ করে দিল সভা। কিন্তু কর্তৃপক্ষের চাপ নোয়াতে পারেনি এঙ্গেলসকে। সভা না করতে পারলেও, তিনি ছোট বড় প্রচারপত্র, প্রচার পুস্তিকা লিখেছেন, পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখেছেন, পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ মানুষের কাছে কমিউনিজমকে পৌঁছে দেয়ার জন্যে এঙ্গেলস পরিস্থিতি অনুসারে কৌশল বদল করেছেন বার বার। জার্মানির অন্যান্য শহরেও সেসময় কমিউনিজমে বিশ্বাসী আরো কয়েকজন মানুষ ছিলেন। এঙ্গেলস তাঁদের সাথে যোগাযোগ করলেন। সেসময় ব্যাভেরিয়া নিবাসী ফয়েরবাখকে এঙ্গেলস আমন্ত্রণ জানালেন কমিউনিজম প্রচারে যোগ দিতে। ফয়েরবাখ অবশ্য এঙ্গেলসের আমন্ত্রণে সাড়া দেননি। পুলিশের কড়া নজর এড়িয়ে এঙ্গেলসকে তখন অত্যন্ত গোপনে কাজকর্ম করতে হতো। একদিকে প্রুশিয়ার সরকারের অনুরোধে ফ্রান্স থেকে বহিষ্কৃত হতে হয় কার্ল মার্কসকে। মার্কস তখন চলে আসেন ব্রাসেলসে। এই পরিস্থিতিতে এঙ্গেলস মার্কস এবং তাঁর পরিবারের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। ফ্রান্সের পুলিশকে লক্ষ্য করে এঙ্গেলস বলেছিলেন, “অন্তত কুকুরগুলো মার্কসকে আর্থিক অসুবিধায় ফেলে সন্তুষ্ট হতে পারবে না।” এঙ্গেলস তাঁর বক্তৃতায়, লেখায় ও কার্যকলাপে প্রশাসনকে যেমন অশান্তির মধ্যে ফেলেছিলে, তেমনই পারিবারিক অশান্তির তৈরি করেছিলেন। পিতার অনুরোধে বাধ্য হয়ে পনেরো দিনের জন্যে তাঁর পারিবারিক সূত্রে মালিকানার কারখানাটি দেখভাল করেছিলেন।

কিন্তু সেখানেও তিনি বুর্জোয়া সমাজের ক্ষতগুলো অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছেন, শ্রমিকশ্রেণির প্রকৃত অবস্থানকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন এঙ্গেলস চেষ্টা করেছেন শ্রমিকশ্রেণির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে লিখতে। তাঁর জন্যে তিনি রসদ সংগ্রহ করেছেন শ্রমিকদের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রাম নিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিরই ফসল হলো, ইংল্যান্ডে শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা (দি কন্ডিশন অব দি ওয়াকিং ক্লাস ইন ইংল্যান্ড)। শিল্প বিপ্লবের ফলে সেসময়ের ইংল্যান্ড পৃথিবীর মধ্যে প্রথম শিল্প কারখানার দেশে পরিণত হয়েছিল। পরিণত হয়েছিল অগ্রণী শিল্প বুর্জোয়া এবং শ্রমিকশ্রেণিসহ চিরায়ত পুঁজিবাদের দেশে। এঙ্গেলস প্রথমে স্থির করে ছিলেন ইংল্যান্ডের সামাজিক ইতিহাস লিখেবেন।

সেই বইয়ের একটা প্রচ্ছদ হবে শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা। তবে পরে তিনি মত বদলান। বহু তথ্য ও পরিসংখ্যান আর সে সময়ের সাহিত্য পড়ে এবং নিজের চোখে শ্রমিকদের অবস্থা দেখে এঙ্গেলস ঠিক করলেন শ্রমিক শ্রেণির অবস্থাই হবে একটি সম্পূর্ণ বইয়ের বিষয়বস্তু। পিটার গাসকেল, জন ওয়েভ, জন রিচার্ডসন প্যাটার, এডোয়ার্ড বেইনস, অ্যান্ডু ইউর, টমাস কার্লাইল প্রমুখ লেখকদের রচনা থেকে তিনি যেমন তথ্য সংগ্রহ করেছেন তেমনই সরকারি রিপোর্ট, সংসদীয় কমিশনগুলোর রিপোর্ট, কারখানা পরিদর্শকদের তৈরি করা তথ্য ও পরিসংখ্যান দিয়ে ও এঙ্গেলস বইটিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি সরাসরি শ্রমিকদের কথাও তুলে ধরেছেন। সেসময় নর্দান স্টার নামে একটি পত্রিকা শ্রমিকদের চিঠি এবং প্রবন্ধ প্রকাশ করত। আরো অনেক সংবাদপত্র ও পত্রপত্রিকাতে প্রকাশিত শ্রমিকদের কথাও ঠাঁই পেয়েছে এঙ্গেলসের বইতে। এঙ্গেলসের এই বই সাড়া জাগিয়েছিল ইংল্যান্ডের মানুষের মধ্যে। এঙ্গেলস তাঁর বইয়ে শুধু শ্রমিকশ্রেণির দুঃসহ অর্থনৈতিক অবস্থার কথাই বর্ণনা করেননি, তিনি সমাজতন্ত্রের জন্যে সংগ্রাম করে তাদের মুক্তি পথও দেখিয়েছিলেন।

শ্রমিকশ্রেণি যখন বুঝতে পারে সমাজতন্ত্রেই রয়েছে তাদের প্রকৃত মুক্তি এবং সংগ্রামের লক্ষ্য হয় সমাজতন্ত্র তখনই শ্রমিকশ্রেণি নিজেদের সংগঠিত শক্তি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। সে সময়ে শ্রমিকশ্রেণি তথা সর্বহারার কাছে ওই কথাগুলো সহজবোধ্য করে হাজির করাই হলো এঙ্গেলসের কৃতিত্ব।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে জনগণের বোধগম্য করে মার্কসবাদের প্রচার ছিল অত্যন্ত জটিল ও কঠিন কাজ। সেই কাজটি এঙ্গেলস আজীবন সুচারুভাবে করে গেছেন। সেই প্রচারের কাজে এঙ্গেলস যেমন সভা-সমিতি, প্রচারপত্র, বইকে ব্যবহার করেছেন তেমনই ব্যবহার করেছেন পত্রপত্রিকাকে। পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন। পিতার কথায় অনেকটা বাধ্য হয়ে পারিবারিক ব্যবসাতে ঢুকলেও এঙ্গেলস ব্রেমেন নগরীর বন্দর মজদুরদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন লেখায়। তিনি লিখতেন অসওয়াল্ড ছদ্মনামে ১৮৪৪ সালে মার্কস সম্পাদনা করতেন জার্মান সাময়িকপত্র জার্মান ফরাসি ইয়ারবুক। ওই সাময়িকপত্রটি সম্পাদনায় মার্কসকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন এঙ্গেলস। মার্কস ও এঙ্গেলস এবং তার সাথীরা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা প্রচারের লক্ষ্যে কমিউনিস্ট লীগের মুখপত্র প্রকাশের প্রয়োজন অনুভব করেন। তাঁদের পরিকল্পনা অনুসারেই ডয়েটসে ব্রাসেলস তজাইটুং পত্রিকাটি লীগের মুখপত্রে পরিণত হয়েছিল। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো জার্মানিতেও উনিশ শতকের মাঝামাঝি আন্দোলন সংগ্রামে অংশ নিতে শুরু করে মানুষ। মার্কস ও এঙ্গেলস দেশে ফিরে আসেন। কলোন শহর থেকে প্রকাশ করতে শুরু করেন নিউ রাইনসে তজাইটুং পত্রিকা। এঙ্গেলস একদিকে ওই পত্রিকা প্রকাশের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করছেন আবার কমিউনিজম প্রচারে কাজ করছেন। ১৮৪৯ সালে পুলিস পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। কমিউনিস্ট লীগ ও তার নেতাদের উৎখাত করতে প্রুশিয়া সরকার শুরু করে কলোন কমিউনিস্ট হামলা। তবে কোন ধরনের আক্রমণ, দমনই এঙ্গেলসের লেখনি ও কার্যকলাপকে থামিয়ে দিতে পারেনি। এঙ্গেলস যখনই সময় পেয়েছেন তখনই মার্কসের রচনা অনুবাদ করেছেন। এঙ্গেলস মার্কসের রচনাগুলো ফরাসি, ইতালি, ইংরেজি ও স্প্যানিস ভাষায় অনুবাদ করেছেন। তবে যে ভাষাতেই অনুবাদ হোক না কেন এঙ্গেলস তার দেখাশোনা করেছেন। কারণ তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল গুণগত মানকে ধরে রাখা। শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে ইউরোপের জনগণের মধ্যে কমিউনিজমের ভাবধারার প্রচার, শ্রমিকশ্রেণিকে সংগঠিত করার কাজে মার্কসের জয়লাভ– এসবের মূলে নিহিত রয়েছে এঙ্গেলসের সাবলীল, স্বচ্ছন্দ, সহজবোধ্য উপস্থাপনা। পত্রপত্রিকায় প্রচারপত্রের লেখনি যে কঠিন ও জটিল করে তুলতে নেই তা এঙ্গেলস শিখিয়েছেন তাঁর সময় থেকেই।

কমিউনিজম প্রচারের কাজে সব দেশেই বিভিন্ন সময় বাধার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়েছে। এখনও হচ্ছে। ভাবাদর্শ প্রচার বা ইতিবাচক বিষয়ের প্রচার কখনোই বাধাবিহীন হয় না। তার ওপর বড় বাধা থাকে কঠিন তত্ত্বকে সহজ বিন্যাসে উপস্থাপিত করা। মানুষ তখনই একটি মতবাদ বা বক্তব্যকে গ্রহণ করে যখন তা সে তার জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে নিতে পারে। ১৯৭১ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপ্লব হয়েছে। সেখানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তারপর থেকে সেই দেশ বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বারে বারে আক্রান্ত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো রক্তক্ষয়ী এক আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে। স্তালিনগ্রাদ অবরুদ্ধ হয়েছিল দিনের পর দিন। সেক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে লাল ফৌজ লড়াই চালিয়েছে, সমর্থন পেয়েছে সকল লোকের। লাল ফৌজের এই বীরত্বকেও সে সময় মানুষের মধ্যে প্রচারের প্রয়োজন ছিল। এম আই কালিনিন সেসময় সঠিকভাবে একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘দু’বছর আগে আমরা যেভাবে প্রচার করেছি, এখন অবশ্যই আমরা সেভাবে প্রচার করতে পারি না। তখন আমরা উচ্ছ্বাস দিয়ে মানুষের মন ভরিয়ে দিতে পারতাম কিন্তু তখনকার দুর্দশার মধ্যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে সেই উচ্ছ্বাস আনলে আমরা ভুল করবো। কালিনিন আরো বলেছিলেন, সরকারি ভাষ্যে অনেক সময়ই সেনা বা সেনানায়কের বীরত্বের প্রশংসা করা হয় বড় বড় এবং ভারী ভারী শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু শব্দ ব্যবহার করে প্রশংসা করলেই মানুষ তা বিশ্বাস নাও করতে পারেন। সব থেকে বড় প্রশংসা হলো তাদের বীরত্বের ঘটনার প্রকৃত বিবরণ। প্রতিদিনই সেরকম কোনো না কোনো ঘটেছে। কালিনিন তখন বলেছিলেন, আমাদের পার্টি পত্রিকা এখনও ওই নতুন পরিস্থিতির সাথে পুরোপুরি তাল রাখতে পারেনি। যেসব লেখক এবং সাংবাদিক যুদ্ধের জীবন্ত বিবরণ পাঠাচ্ছেন তার থেকে শিখতে হবে, জানতে হবে। কেমন করে স্তালিনগ্রাদের পথে ৪ জনের একটি দল শত্রুর ৩০টি ট্যাংকের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছিল তার বিবরণ দিলেই মানুষ বুঝতে পারবেন বীরত্বের গভীরতা। কোন একজনের কাহিনি তুলে ধরে বলতে হবে তরুণ তরুণীরা কীভাবে জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তাদের পড়ে থাকা অনেক অনেক বছরগুলোর স্বপ্নকে উপেক্ষা করছে। তবেই আমরা অনুপ্রাণিত করতে পারবো আরো বেশি বেশি মানুষকে দেশ রক্ষায়, সমাজতন্ত্র রক্ষায়। কালিনিন কখনও বলেননি অন্য লেখককে যান্ত্রিকভাবে অনুকরণ করতে। পরিস্থিতি অনুসারে অর্থাৎ স্থান-কাল-পাত্র অনুসারে সেই অনুকরণকে নিজের মতো করে নিতে বলেছেন। এই যুদ্ধের পরিস্থিতিতে মতাদর্শের কথা একভাবে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে– আবার শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সেই পথকেই আবার বদলাতে হবে।

পত্রিকা, প্রচার পুস্তিকা, পুস্তক হলো কমিউনিস্টদের মতাদর্শ প্রচারের বড় হাতিয়ার। মার্কসবাদ প্রচারের গোড়ার যুগ থেকেই এই হাতিয়ার কাজ করছে। কখনোই তা অচল হয়ে যায়নি। অবশ্যই সে হাতিয়ারের ধার শক্তি ক্ষমতা নির্ভর করেছে যোদ্ধাদের ওপর। এই জটিল ও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্রের অবিচল প্রচারই মানুষের মার্কসবাদের প্রতি বিশ্বাসকে আবার দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আমরা জানি ড্যুরিং-র মতবাদ জার্মান শ্রমিক আন্দোলনের যথেষ্ট ক্ষতি করেছিল। ড্যুরিং-এর তাত্ত্বিক বক্তব্যের জবাবে এঙ্গেলস সরাসরি লিখেছিলেন অ্যান্টি ড্যুরিং। সমাজতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে হাজির করে ওই বইটি ড্যুরিং-এর বিভ্রান্তিকর মতবাদের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল। আবার ওই বক্তব্যকে আরো সরল করে শ্রমিক শ্রেণির কাছে তুলে ধরার জন্যে ওই বইটির তিনটি পরিচ্ছদ নিয়ে এঙ্গেলস লিখে ছিলেন “ইউটোপিয় ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র” নামে নতুন অন্য একটি বই। ওই বইটি শুধু জার্মানিতেই নয় অন্য দেশে দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এঙ্গেলসের লিখেছেন, ১৮৮০ সালে তাঁর সাংবাদিকসুলভ রচনাশৈলী অবশ্যই শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে মার্কসবাদের আদর্শগত বিজয় অর্জন করতে সাহায্য করেছিল। এই রচনাগুরেঅ ইউরোপের সমাজতন্ত্রের এবং অগ্রণী শ্রমিকদের বুর্জোয়া এবং পেটি বুর্জোয়া সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার সারবস্তুকে পর্যালোচনা করতে সাহায্য করেছিল। তার ফলস্বরূপ সংগঠিত হয়েছিল স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সর্বহারাদের পার্টি। লেখক হিসেবে এঙ্গেলস নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন অবিরাম পুস্তক রচনা, অনুবাদ, প্রবন্ধ রচনা, পুস্তকের ভূমিকা লেখার মধ্যে দিয়ে।

হলডেন এঙ্গেলসকে ভূষিত করেছিলেন সে যুগের সব থেকে বিদ্বান ব্যক্তি হিসেবে। বিজ্ঞানী হলডেন মনে করতেন এই জ্ঞানের গভীরতার জন্যেই তিনি সহজ সরলভাবে মার্কসবাদের তত্ত্বগুলোকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারতেন। কমিউনিস্ট ভাবধারা প্রচারের এই শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক।

লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 16
    Shares