মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১

একজন গৌরীদাসী, হাইকোর্টের রায় নতুন দিনের আশা

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 158
    Shares

সুতপা বেদজ্ঞ ::

গত ২ সেপ্টেম্বর (২০২০) হাইকোর্ট হিন্দু বিধবাদের স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। এই রায়ের ক্ষেত্রে অ্যামিকাস কিউরি (আদালতে আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন অ্যাডভোকেট উজ্জ্বল কুমার ভৌমিক। রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘হিন্দু বিধবা নিজ প্রয়োজনে কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে সম্পত্তি বিক্রিও করতে পারবেন। এ রায় অবশ্যই একটি মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত হবে।’

হাইকোর্টের যুগান্তকারী এ রায়টির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, অধিকারহীনতার বেদনা। ১৯৯৬ সালে খুলনার বটিয়াঘাটার হিন্দু বিধবা গৌরীদাসীর নামে কৃষিজমি রেকর্ড হয়। এর বিরুদ্ধে একই বছর খুলনার বিচারিক আদালতে মামলা করেন গৌরীদাসীর দেবর জ্যোতিন্দ্রনাথ ম-ল। শুনানি শেষে বিচারিক আদালত এই মামলার রায়ে বলেন, হিন্দু বিধবারা স্বামীর অকৃষি জমিতে (জীবনস্বত্ব) অধিকার থাকলেও কৃষিজমির অধিকার রাখেন না। এর পর এ রায়ের বিরুদ্ধে গৌরীদাসী খুলনার জজ আদালতে ওই বছরই আপিল আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু বিধবা স্বামীর কৃষিজমির ভাগ পাবেন মর্মে ২০০৪ সালে খুলনার জজ আদালত রায় দেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করা হয়। উভয়পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে এবং অ্যামিকাস কিউরির মতামত নিয়ে হাইকোর্ট বিধবাদের পক্ষে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয় ‘একজন হিন্দু বিধবা তার স্বামীর কৃষিজমিতে আনুপাতিক হারে সম্পত্তির ভাগ পাবেন।’

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নাগরিক জীবনের সব ক্ষেত্রে সাংবিধানিক আইন কার্যকর থাকলেও কেবল সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিয়ে, অভিভাবকত্ব, এক কথায় পারিবারিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রগুলোয় ধর্মীয় আইন কার্যকর। আমাদের পরিবার ও সমাজব্যবস্থা পুরুষপ্রধান হওয়ায় সঙ্গত কারণে ওইসব ক্ষেত্রে নারীর প্রতি ন্যায্যতা ও সমতার প্রশ্নটি বরাবরই উপেক্ষিত। সম্পত্তির ক্ষেত্রে নারীদের সমানাধিকারের প্রশ্ন তুললেই সমাজের পুরুষ প্রভুরা ধর্ম গেল গেল বলে রা রা করে ওঠেন- যেন নারীরা সমানাধিকার পেলেই ধর্ম-সমাজ সব উচ্ছন্নে যাবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের বর্তমান প্রচলিত হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের অসঙ্গতি ও তার পরিণতি সম্পর্কে কিছু আলোচনার অবতারণা করতে চাই।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রচলিত হিন্দু উত্তরাধিকার আইন নারীর জন্য অমর্যাদাকর, বৈষম্যমূলক। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা কিছু বিশ্বাস, আচার-আচরণ, কুপ্রথাই এই আইনের ভিত্তি। সময়ের প্রয়োজনে মানুষের জীবনযাপন, আচার-আচরণ, ঘরে-বাইরে কাজ-কর্ম, আয়-উৎপাদনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি থেকে শুরু করে দিনমজুরি, মেধাভিত্তিক এমন কোনো ক্ষেত্র নেই- যেখানে নারীদের পদচারণায় মুখরিত হচ্ছে না। অন্যান্য সমাজের সঙ্গে হিন্দুসমাজও নানা কুপ্রথা-কুসংস্কার বর্জন করে প্রগতির যাত্রায় শামিল হয়েছে। এত কিছু সত্ত্বেও নারীর সম্পত্তিতে অধিকারের ব্যাপারে বাংলাদেশের হিন্দুসমাজের কিছু পুরুষতান্ত্রিক ব্রাহ্মণ্যবাদী মৌলবাদী প্রতিনিধি আজও পরিবর্তনের বিপক্ষে অবস্থান করছে। সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রও হিন্দু নারীদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করছে না। শুধু আইনের কারণে এ দেশের হিন্দু নারীরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে মর্যাদাহীন অবস্থায় পরিবারে বসবাস করছেন। অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন কঠিন মানবেতর জীবনযাপন করতে।

১৯৩৭ সালের হিন্দু সম্পত্তি আইনে স্বামীর অকৃষিজমিতে স্ত্রীর অধিকার থাকলেও কৃষিজমিতে বঞ্চিত করা হয়। বাংলায় ব্রিটিশ শাসকরা সম্পত্তি বণ্টন, উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারক্রম নির্ণয়ের আইনের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেননি। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ভারতে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে পরিবর্তন ঘটে। ১৯৫৫ সালে ভারতে নতুন বিবাহ আইন প্রচলিত হয়- যাতে বিবাহ পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটে এবং বহুপত্নীর বিধান বিলুপ্ত হয়। বিবাহ বিচ্ছেদ পদ্ধতিরও পরিবর্তন হয়। ১৯৫৬ সালে অন্য একটি ধারাবলে দায়ভাগ বা মিতাক্ষরার মাধ্যমে উত্তরাধিকারক্রম পরিবর্তিত হয়। পিতা বা মাতার মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যা- উভয়ের সমান অংশ এবং স্ত্রী বা স্বামীর এক-তৃতীয়াংশ পাওনা স্বীকৃত হয়। কিন্তু পাকিস্তানে ওই পুরনো হিন্দু আইন বলবৎ থাকে। বর্তমান বাংলাদেশ তৎকালীন পাকিস্তানের অংশ হওয়ায় একই আইন পূর্ব পাকিস্তানে বলবৎ করা হয়। পরিতাপের বিষয় এই যে, স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরেও এই আইন সংশোধিত হলো না।

হিন্দু আইনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই দেখা যায়, এটি কোনো ধর্মীয় বিধি নয়। এই আইন কেবল আঞ্চলিক ও সামাজিক প্রথার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করেন। তারা ওই দেশের প্রচলিত আইন ও বণ্টনব্যবস্থার ভিত্তিতে সম্পত্তির অধিকার লাভ করেন। ভারতেও হিন্দু আইন সর্বত্র এক রকম নয়। ভারতের কোনো কোনো প্রদেশে এখনো মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। ওইসব ঘরানার প্রথাগত আইন অনুযায়ী মেয়েদেরই সম্পতিতে অগ্রাধিকার। অথচ তারাও হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সময় এগিয়েছে। ধর্মীয় আচার-আচরণ ও প্রথায় পরিবর্তন এসেছে। অনেক কুপ্রথা থেকে আজ হিন্দুসমাজ মুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে এখন পর্যন্ত কন্যাশিশুদের পিতার সম্পত্তিতে অধিকার, স্বামীর সম্পত্তিতে নিঃশর্ত অধিকার, বিয়ে নিবন্ধন, বিয়ে বিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি আইনি অধিকারের প্রশ্ন অমীমাংসিত। শুধু কন্যাশিশুদের পিতার সম্পত্তিতে অধিকার না থাকায় যৌতুকের মতো কুপ্রথা হিন্দুসমাজে বলবৎ রয়েছে। অথচ রাষ্ট্রে যৌতুকবিরোধী আইন আছে। মেয়েদের সম্পত্তিতে অধিকার না দিলে সমাজ থেকে যৌতুক প্রথা কাগজ-কলমে বন্ধ হলেও বাস্তবে রোধ করা যাবে না, এখনো যায়নি। এই বাস্তবতায় গৌরীদাসীর দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল হাইকোর্টের রায়টি এতদিনের বৈষম্যের বেড়াজাল দূর হওয়ার প্রথম ধাপ, ইতিবাচক সূচনা। এটিকে পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া, এর পক্ষে সংসদে আইন পাস করা এখন রাজনৈতিক কর্তব্য।

যেহেতু হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ধর্মের কোনো অঙ্গ নয়, সেহেতু ধর্মের দোহাই দিয়ে এর পরিবর্তন না করা যুক্তিহীন। ১৯৭২ সালে আমরা নারী-পুরুষের সমঅধিকারভিত্তিক প্রগতিশীল এক সংবিধান পেয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র এমন কোনো আইন প্রণয়ন করবে না- যা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এ ধরনের কোনো আইন থাকলেও তা বাতিল বলে গণ্য হবে।’ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সকল নাগরিকের সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন; (২)-এ বলা আছে, ‘মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’ তাই সংবিধানের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হিন্দু আইন সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।

যে কোনো আইন, বিশেষ করে ধর্মীয় আইনের মতো সংবেদনশীল বিষয় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সামনে উদাহরণ থাকতে হয়। ওই উদাহরণ আছেও। আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারত পেরেছে, নেপাল পেরেছে। বাংলাদেশ কেন পারবে না? যুগ যুগ ধরে চলে আসা হিন্দুসমাজের বিধান সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হয়েছে। ভারতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। নেপালে সমঅধিকার রয়েছে। এতে ভারতীয় বা নেপালীয় হিন্দুদের হিন্দুত্ব ক্ষুণ্ন হয়নি। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক প্রাচীনপন্থী গোঁড়ামিপূর্ণ কতিপয় হিন্দু নেতাদের কাছে এ দেশের সমাজ ও রাষ্ট্র জিম্মি হয়ে থাকা মোটেও কাজের কথা নয়।

আজ সমাজের সর্বত্র নারীর ক্ষমতায়ন ও সমমর্যাদার দাবি উঠেছে। এসব দাবি অর্থহীন হবে- যদি নারীকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান ও আইনি প্রক্রিয়ায় মর্যাদাবান করা না যায়। নারীকে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল রেখে, আইনের ক্ষেত্রে বৈষম্য রেখে সমাজ ও সভ্যতার বিকাশকে কোনোভাবেই অগ্রসর করে নেওয়া সম্ভব নয়। লিঙ্গবৈষম্যের বিষবৃক্ষ পুষে রাখলে সমাজে নারীর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সমাজ-সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থেই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে পুত্রের সঙ্গে কন্যাকেও সমান অধিকার দেওয়া প্রয়োজন। সন্তানের ভরণ-পোষণ, অভিভাবকত্ব ও দত্তক আইনের ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট করা দরকার যাতে নারীরা কোনোভাবেই যেন বঞ্চিত না হন।

গৌরীদাসীর স্বামী অভিমান্য ম-ল ১৯৫৮ সালে মারা যান। বাল্যবিধবা এই নারী স্বামী হারিয়ে একাকিত্ব জীবনযাপন করছেন ৬২ বছর ধরে। অধিকারের জন্য আদালতেই লড়তে হয়েছে ২৪ বছর। গৌরীদাসী বীর নারীদের প্রতীক। গৌরীদাসী আমাদের নমস্য। তিনি শৃঙ্খল ভাঙার পথ দেখিয়েছেন। গৌরীদাসীর লড়াই ও হাইকোর্টের রায় আমাদের ভাবনার জগৎকে আন্দোলিত করেছে, দিয়েছে নতুন আলোর সন্ধান। এ আলো শত-সহস্র শিখায় প্রজ্জ্বলিত করতে হলে চাই সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের জাগরণ, রাষ্ট্রের সক্রিয় উদ্যোগ।

লেখক: সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), খুলনা জেলা কমিটি


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 158
    Shares