শনিবার, ডিসেম্বর ৫

ইরফানের সাজাঃ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মানদন্ড নয়

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 31
    Shares

আবু নাসের অনীক::

সাংসদ হাজী সেলিমের পুত্র সন্ত্রাসী ওয়ার্ড কমিশনার(বরখাস্তকৃত) ইরফান সেলিমের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দেড় বছরের জেল হয়েছে মাদক ও ওয়াকিটকি রাখার দায়ে। এতেই ক্ষমতাসীনদল এবং তাদের মতাদর্শে লালিত বুদ্ধিজীবীগণ গলা ছেড়ে এই ঘটনাকে ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার’ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে এষ্টাবলিশ করার জন্য মরিয়া হয়ে গেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সবখানে।
পাঠক, ঘটনার দিকে একটু নজর দি। নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার ইরফান বাহিনী কর্তৃক দুই দাঁত হারানোর খেসারতে তাকে এই শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করুন, আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া আরো অনেক ঘটনার মতো এই ঘটনা যদি আমার বা আপনার সাথে ঘটতো, যদি দুই দাঁতের পরিবর্তে সব দাঁত খেসারত দিতে হতো, এমনকি যদি জীবনটাও চলে যেত তার প্রতিক্রিয়াতে কী এই শাস্তি ঘটতো! নিশ্চিতভাবেই বলা যায় ঘটতো না, ঘটছে না।

আসুন, একটু কারণ অনুসন্ধান করি কেন শাস্তির ঘটনাটি ঘটলো। এই ঘটনাটি সরকারের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়ার বস্তুত কোন সুযোগ ছিলোনা। সরকার রাষ্ট্রের যে সকল কম্পনেন্টের মাধ্যমে তার ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র জারি রেখেছে বাহিনীগুলো তার একটি পার্ট। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলে যে গুন্ডাতন্ত্র কায়েম হয়েছে ‘ইরফান’ রা তার বাস্তবায়নকারী। একচেটিয়া ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য কখনও যদি বাস্তবায়নকারী ও মাধ্যম মুখোমুখি হয়ে যায় তখন সরকার বাস্তবায়নকারীকে ছেটে ফেলে।

যে সরকার জনগণকে পাশ কাটিয়ে তার ক্ষমতাকে এবসুলুট করতে চায় তার কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘মাধ্যম’। ‘বাস্তবায়নকারী’ কে প্রতিনিয়তো তৈরি করা যায় কিন্তু ‘মাধ্যম’ যদি এনয়েড হয়ে যায় তবে সেই সময়ে সরকারের অস্তিত্ব ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্টের ক্ষেত্রে যা ঘটবে নিশ্চয় আপনার-আমার মতো আমজনতার বিষয়ে সেটি ঘটবেনা।

একটু পিছনের দিকে যায়। সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা ক্রসফায়ারে হত্যাকান্ডের পূর্বে এই সরকারের সময়ে শত শত ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারের জনপ্রতিনিধি একরামের ক্রসফায়ারের বিষয়টি একটু স্মরণে আনুন। তার ঘটনাসহ কোন ঘটনাতেই সরকার কার্যকরভাবে রিএ্যাক্ট করেনি। কিন্তু সিনহার ঘটনাতে প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য হয়েছে, তার সামনে অন্য কোন অপসন ছিলোনা।

কারণ রাওয়া ক্লাবের পক্ষ থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছিলো, এমন কী রাজপথে নামার হুমকী ছিলো। এবং সাবেক সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে মিডিয়ার সামনে ঘোষণা করেছিলো এমন ঘটনা আর সহ্য করা হবেনা। যার কারণেই নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট যখন আক্রান্ত হন তখন সরকারকে বাধ্য হয়ে এক দিনের মধ্যেই শাস্তির ব্যবস্থা করতে হয়। অর্থাৎ সরকার সেই ঘটনার বিষয়ে কার্যকরভাবে রিএ্যাক্ট করে যেটি অপসনলেস। এই সিলেক্টটিভ ওয়েতে কখনওই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলা যায়না। একজন বা দুইজন ইরফান খাঁচার মধ্যে থাকলেও হাজারটা ইরফান গুন্ডাতন্ত্র কায়েমের জন্য বাইরে ঘুর-ঘুর করছে।

গত ১১ অক্টোবর ২০২০ পুলিশী হেফাজতে নির্যাতনে সিলেটে রায়হান নিহত হন। সেই হত্যাকান্ডের প্রধান আসামী পুলিশ কর্মকর্তা আকবরকে গ্রেপ্তার করার জন্য নিহত রায়হানের মাকে অনশন করে দাবি জানাতে হয়। সেই আসামী এখনও গ্রেপ্তার এড়িয়ে থাকতে সক্ষম হয়। হিসাব খুব পরিষ্কার। রায়হান ক্ষমতাবলয়ের কেউ নয়, হলে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই আসামী গ্রেপ্তার হতো, পালিয়ে যাবার সুযোগ পেতোনা। তারপরেও সরকার কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এবং সেটাকে কেন্দ্রকরে গণবিক্ষোভের কারণে। একটি ঘটনাাও খুঁজে পাওয়া যাবেনা সরকার স্বতঃস্ফুর্তভাবে নিজের মতো করে ব্যবস্থা নিয়েছে। নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্টের ওপর হামলার ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

সন্ত্রাসী ইরফানের সাম্রাজ্যে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব টর্চার সেল থেকে শুরু করে অবৈধ অস্ত্র সবকিছুই পেয়েছে। পেয়েছে অত্যাধুনিক সিগন্যালিং সিস্টেম। এই যে তার সাম্রাজ্য এটা তো এক দিনে গড়ে ওঠেনি। র‌্যাবসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার রাডারে এতোদিন কিছুই ধরা পড়েনি এটা কোনভাবেই গ্রহণীয় নয়। যারা কে কোথায় কখন কাকে ফোন করছে সেই সিগন্যাল ট্র্যাক করে কনভারসেশন রেকর্ড করছে তাদের কাছে ইরফানের সিগন্যাল রুমের সিগন্যাল এড়িযে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এড়িয়ে গেছে, কারণ তাদের ওদিকে মনযোগ দিতে বলা হয়নি তারাও মনযোগ দেয়নি।
কোন একটা গলিতে সিসি ক্যামেরা লাগাতে হলেও তার জন্য সংশ্লিষ্ট থানার অনুমোদন নিতে হয়, আর গোটা একটা ওয়ার্ড একজন ব্যক্তির উদ্যোগে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হলো, উচ্চগতির সিগন্যাল সিস্টেম দিয়ে ৪ কিমি এলাকার মধ্যে মানুষের কথোপকথন শোনার ব্যবস্থা করা হলো আর সংশ্লিষ্ট থানা, গোয়েন্দা সংস্থা কিছুই জানলোনা এটা একটা অবাস্তব গল্প। অবশ্য গল্প সবসময় অবাস্তবই হয়! সেকারণেই তাকে গল্প বলা হয়।

সন্ত্রাসী ইরফানের এই বিষয়গুলো এখনও সামনে আসতোনা, হয়তো কোন সময়েই আসতোনা যদি না সে ভুল করে নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্টের সাথে ঘটনাটি না ঘটাতো! যেমনভাবে ওসি(বরখাস্তকৃত) প্রদীপের কোন ঘটনায় সামনে আসতো না, যদি না কিনা সে মেজর(অব:) সিনহার হত্যাকান্ড না ঘটাতো। সবকিছুই যেমন নিরিবিলি হজম করে যাচ্ছিলো তেমনই হজম করে যেতো।

ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র যারা টিকিয়ে রাখার জন্য অর্থাৎ বাস্তবায়নকারী হিসাবে ভূমিকা রাখে তারা ক্ষমতার স্বাদ অনুভব করতে করতে একটা পর্যায়ে যেয়ে নিজেই ক্ষমতার উৎস হয়ে উঠতে চায়। আর ঠিক তখনই এমন কিছু বিপত্তি ঘটিয়ে ফেলে যার জন্য তাদের সাময়িকভাবে হলেও এমন অবস্থার সম্মুখিন হতে হয়। কোন কোন সময় তাদের পৃথিবীতে থাকার মেয়াদও শেষ হয়ে যায়! আর বাজারে যেহেতু প্রচুর মাল রয়েছে সেক্ষেত্রে যে মাল ভিতরে চালান হয় বা পৃথিবীতেই অস্তিত্ব থাকেনা তার জায়গায় আমদানি করা হয় নতুন মাল, এবং এটা হয় খুবই সহজলভ্য। কারণ উৎপাদনের উৎস থাকে অক্ষত এবং দিন যতো যায় উৎপাদন যন্ত্র ততোই শক্তিশালী হয়ে ওঠে!

দেখুন, এতোদিন দুদক টু শব্দটি করেনি , গতকালের পর থেকেই তারা ইরফান ও তার বাবা সাংসদ হাজী সেলিমের অবৈধ সম্পদের হিসাব খুঁজতে ঝাপিয়ে পড়েছে। ঠিক যেমন ঝাপিয়ে পড়েছিলো ওসি প্রদীদের অবৈধ সম্পদের খোঁজে। অথচ সরকারের পদক্ষেপের আগে প্রতিষ্ঠানটি মুখে আঙ্গুল দিয়ে বসেছিলো। দুদকের কিন্তু অবৈধ সম্পদের খোঁজ-খবর রাখার জন্য একটি নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগ আছে। এটা একটা ওপেন সিক্রেট বিষয় সাংসদ হাজী সেলিমের দখলে অবৈধভাবে প্রচুর জায়গা-জমি আছে, ইতিমধ্যে জনতা ব্যাংকের জায়গাটি উদ্ধার করা হয়েছে, এবং সেটিও মাত্র একদিনের মধ্যে! লক্ষনীয় বিষয় এই ঘটনার আগ পর্যন্ত প্রশাসন ছিলো নিশ্চুপ।

এই গোয়েন্দা বিভাগটি তখনই সক্রিয় হয় যখন সরকার মাথা কাত করে ঠিক তখন। তার পূর্বে নয়। অথচ দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, কাজের আওতা ও আইনি স্বাধীনতা থাকা সত্বেও সরকারের ইঙ্গিত ব্যাতীত সে একটি পদক্ষেপও গ্রহণ করেনা। সরকার যখন ইরফান বা ওসি প্রদীপের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয় দুদকও ঠিক সেই সময়ে একই কারণে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।

উপরোক্ত আলোচনা এটাই নির্দেশ করে একজন ইরফান, এসআই আরমান বা ওসি প্রদীপকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করলেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়না। যখন শাহেদ, সাবরিনা, পাপিয়াদের পৃষ্টপোষকদের আড়াল করে শুধুমাত্র তাদের বিচার করা হয় সেই বিচার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত করেনা। বরং সেটা ইঙ্গিত করে বর্তমানে একচেটিয়া ক্ষমতাতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র জারি রাখার জন্য যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা সেটাকেই যাতে টিকিয়ে রাখা যায়।

যেখানে সাগর, রুনি, ত্বকী, তনুর মতো আরো অসংখ্য হত্যাকান্ডের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে বিচার সম্পন্ন হয় না। এই হত্যাকান্ডগুলোর মতো আরো অনেক ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় তুলেছে কিন্তু এরা কেউই ক্ষমতাবলয়ের অংশ নয় সেকারণেই এদের বিচার থমকে আছে, থমকে থাকবে বর্তমান এই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থায় কোন কিছুই শ্রেণি নিরেপেক্ষ নয়। রাষ্ট্রের আইন-কানুন, বিচার ব্যবস্থা সব কিছুই তৈরি হয় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির পক্ষে। এখানেও তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটছে না। লুটেরা-ধনীক শ্রেণির শাষকগোষ্ঠির রাজনৈতিক শক্তির শ্রেণি স্বার্থ রক্ষার জন্যই সকল আয়োজন।

দেশে আইনের শাসন এমনি এমনি প্রতিষ্ঠা হবেনা। সংবিধানের একটি দুটি বিষয় বা তার চেয়ে আরো বেশি সংশোধনী এনেও এটা হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সংগ্রাম। এই সংগ্রাম পরিচালিত হতে হবে বিদ্যমান লুটেরা শাষকগোষ্ঠীর সেবাদানকারী রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা উচ্ছেদ করে গণমানুষের রাজ কায়েমের মধ্যে দিয়ে। এর বিকল্প অন্য কোন পথে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব নয় এটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত বিষয়।
‘যুগান্ত জোড়া জড়রাত্রির শেষে দিগন্ত দেখি স্তম্ভিত লাল আলো, রুক্ষ মাঠেতে সবুজ ঘনায় এসে নতুন দেশের যাত্রিরা চমকালো। চলতি ট্রেনের চাকায় গুঁড়ায়ে দম্ভ পতাকা উড়াই: মিলিত জয়স্তম্ভ মুক্তির ঝড়ে শত্রুরা হতভম্ব। আমরা কঠিন পণ।।’

লেখক: সাবেক সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 31
    Shares