মঙ্গলবার, মে ১৮
শীর্ষ সংবাদ

আনভীর’দের বিচার করতে এই সমাজ-রাষ্ট্র অনুপযুক্ত!

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 14
    Shares

আবু নাসের অনীক::

মুনিয়া, তোমার মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয়। তার মৃত্যু আত্মহত্যা, না হত্যা এটা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। মেয়েটির মৃত্যুর সাথে একটি নাম উচ্চারিত হচ্ছে, বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর। যিনি এ দেশের ক্ষমতাবানদের মধ্যে অন্যতম।

ইতিমধ্যে এটি প্রকাশিত আনভীর সাথে মুনিয়ার সম্পর্ক ছিলো। মৃত্যুর পূর্বে এই সম্পর্কে সংকট তৈরি হয় এবং তাকে কেন্দ্র করেই মুনিয়ার আত্মহত্যা / হত্যা। ভিকটিমের বোন বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে আনভীরকে একমাত্র আসামী করে মামলা করেছেন। পুলিশ মামলা গ্রহণ করে তদন্ত শুরু করেছে। আপনাদের নিশ্চয়ই স্মরণে আছে ২০০৬ সালে ৪ জুলাই সাব্বির নামে এক যুবকের মৃত্যুকে আজকের মতো আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা হয়। পরবর্তীতে আনভীর ছোট ভাই সানবীরকে প্রধান আসামী করে মামলা হলেও সরকারপক্ষের সাক্ষী উপস্থিতির ব্যর্থতায় সব আসামী বেকসুর খালাস পায়।

আমরা জানি, বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানায় ১ টি ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ মোট ৪ টি গণমাধ্যম পরিচালিত হয়। এ সমস্ত গণমাধ্যমের প্রভাবে দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমই আনভীরের নামকে আড়াল করে। বলা চলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চাপেই ঘটনার দুদিন পর প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলি পুরোপুরি আড়াল করার প্রচেষ্টা থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের সংবাদ কর্মীদের স্বাধীনতা যে, মালিকের কাছে বন্ধক দেওয়া সেটি আবারো প্রমাণিত হয়েছে। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক!

নব্বই দশকের শুরু থেকেই দেশের লুটেরা ধনীক শ্রেণী তাদের লুটপাটের কর্মকান্ডকে আড়াল করার অস্ত্র হিসাবে মিডিয়া হাউজ গড়ে তোলে। রাতারাতি তারা পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল এর মালিক হতে থাকে। এ সমস্ত গণমাধ্যম ব্যবহার করে দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি-সংস্কৃতিতে তাদের নিরঙ্কুশ প্রভাব বিস্তার করে। সংবাদ কর্মীদের স্বাধীনতা এরাই খর্ব করে। প্রতিষ্ঠিত হয় গণমাধ্যমের মালিকদের স্বাধীনতা। খবর তৈরি হতে থাকে তার মর্জিনুসারে। তারাই তৈরি করে মালিকের ইচ্ছার কাছে নতজানু একদল সংবাদকর্মীদের।

আনভীর সাথে মুনিয়ার সম্পর্ক ও তার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে চিরাচরিতভাবে এই হত্যা বা আত্মহত্যার দায় থেকে পুরুষকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে। আড়াল করার মক্ষম অস্ত্র ভিকটিমের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা। সকলের কাছে তাকে এমনভাবে উপস্থাপন করার প্রানান্তকর চেষ্টা, যেন সমাজ থেকে নোংরা বিদায় হয়েছে এবং এতে সমাজ ভীষণভাবে উপকৃত। অর্থাৎ আত্মহত্যার প্ররোচনা বা হত্যার দায় থেকে ক্ষমতাবান ঐ পুরুষকে আড়াল করা।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বরাবরের ন্যায় এবারো, মুনিয়াকে চরিত্রহীন মেয়ে হিসাবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচলিত গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে কিছু মানুষ সচেষ্ট। এই প্রচেষ্টা গ্রহণে নারী-পরুষ ভেদাভেদ নেই। একজন মৃত মানুষকে অত্যন্ত কদর্য ভাষায় তার চরিত্র হনন ও আক্রমন করা হচ্ছে। কারণ এই আত্মহত্যা/ হত্যার জন্য নিশ্চিতভাবে দায়ী ব্যক্তি একে তো পুরুষ, তার উপর আবার ক্ষমতাবান।

আমরা এমন এক সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাস করি যেখানে সাম্রাজ্যবাদ আর দেশীয় লুটেরা পুঁজিবাদ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের অধীন। আমরা এক অবক্ষয়মূলক সংস্কৃতির মধ্যে নিপতিত। এই সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে ভোগের প্রবণতাকে এমনভাবে উসকে দেয় যা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তোলে। আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত লোভ-লালসায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। পারিবারিক-সামাজিক সকল দায়বদ্ধতাকে পায়ে মাড়িয়ে চলতে শেখায়। ভোগ-বিলাসিতাই জীবনের একমাত্র লক্ষ হয়ে ওঠে।

সমাজের মধ্যে এই লুটেরা ভোগের সংস্কৃতির হেজিমনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই হেজিমনিই ক্ষমতাতন্ত্র-লুটপাটতন্ত্র-গুন্ডাতন্ত্র জারি রাখে, যাতে অবাধে সবকিছু ভোগ করা যায়। এটা এই সমাজের ব্যাধি। যে ব্যাধিতে সমাজের অধিকাংশই কম-বেশি আক্রান্ত। ব্যাধি যাতে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে ঠিক সেই দায়িত্বটি পালন করে থাকে আনভীর’রা, বসুন্ধরার মতো প্রতিষ্ঠান। পুরুষতান্ত্রিক এই লুটেরা রাষ্ট্র-সমাজ ব্যবস্থায় রক্ষিতা তৈরি করে তারা বিকৃত ভোগের চাহিদা মেটাবার জন্য।

একটি ১৭ বছরের কিশোরীকে (আনভীরের সাথে যখন মুনিয়ার সম্পর্ক হয়) প্রজাপতিময় জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে, ভুল পথে পরিচালনা করেছে আনভীর। পূর্বেই আমি এই সমাজের ব্যাধির কথা উল্লেখ করেছি। সেই সমাজের একজন সদস্য হিসাবে মুনিয়াও সেই ব্যাধি দ্বারা প্রভাবিত হবে এটাই তো স্বাভাবিক। কারণ, সেটা তো প্রভাবিত হবার বয়স। যেখানে পরিণত বয়সের মানুষরা প্রভাবিত হচ্ছে, সে তুলনায় সে তো নেহাতই শিশু।

দেশীয় লুটেরা পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবে এখানে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। করোনাকালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিভাগের মতো জায়গায় নয়ছয় ঘটছে। কেনো হচ্ছে এসব?? সবই ভোগ-বিলাসিতার জন্য। মুনিয়া এক লাখ টাকা ভাড়ার ফ্লাটে থাকতো, সেটা তার ভোগের আকাঙ্খা থেকেই। সেটাকে হাই লাইট করা হচ্ছে। কিন্তু যারা রাষ্ট্রের, জনগণের লক্ষ-কোটি টাকা লুটপাট করছে ভোগের উদ্দেশ্যে, তাদের তুলনায় মুনিয়ার ভোগের আকাঙ্খা তো কিছুই না। চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুল্লে আগে তাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। অথচ সমাজে সেটি নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। কারণ এই নষ্ট-পঁচা-গলা সমাজই ঠিক করে দেয় কোনটি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে, কোনটি নিয়ে নয়!!

যারা লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট করে তাদের প্রতি সমাজ ঘৃণা ছড়ায় না, ছড়ায় মুনিয়াদের প্রতি। কারণ তাদের মৃত্যুর জন্য যখন সেই লুটপাটকারী প্রতিভূদের দিকে আঙ্গুল ওঠে। এই লুটপাটাকারীদের মুখে ঘৃণার থুতু ছিটানো উচিত, কিন্তু থুতু ছিটানো হচ্ছে মুনিয়ার দিকে। রেইন্ট্রি হোটেলে ঘটে যাওয়া ঘটনা, কুমিল্লার আরেক মেয়ে তনু নিশ্চয়ই এখনো ভুলে যাননি। এদের প্রত্যেকের চরিত্র হনন করা হয়েছে। কারণ এদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার সাথে যারা এই সমাজে হেজিমনি প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে তারাই দায়ী।

রাষ্ট্র কারা পরিচালনা-নিয়ন্ত্রণ করবে এরাই ঠিক করে। রাষ্ট্রের সমস্ত কম্পোনেন্টে এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে, তাদের অঙ্গুলিলেহনে বিষয়গুলি নির্ধারিত হয়। যে প্রতিষ্ঠান (বসুন্ধরা) শত শত একর খাস জমি দখল করে নিচ্ছে, প্রান্তিক মানুষকে তার ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার পরেও সরকার নিশ্চুপ থাকে, তারাই তো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। লুটেরাদের পক্ষ নিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী গুলি করে শ্রমিক হত্যা করে।

তারা খুন করে ১০০ কোটি টাকায় ডিল করে। ২০ কোটিতে সেটেল হয়, তারা তো বারে বারে খুন করতেই পারে!! কারণ ২০ কোটি টাকা তাদের জন্য কিছুই না। এই টাকার বিনিময়ে যাকে তাকে খুন করার স্বাধীনতা ভোগ করাটাই তাদের জন্য বিনোদন। যাদের এই বিনোদনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবার কথা তারা বাঁধা হয় না। কারণ, যে টাকার বিনিময়ে তারা এই বিনোদন উপভোগ করে সেটা তো সেই তথাকথিত মাননীয়দের মধ্যেই বন্টন হয়। এবারো হয়তো ডিল হবে!! দুই পক্ষই ‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে শাখে শাখে পাখি ডাকে’ ফিলিংস এ থাকে।

মুনিয়ার মৃত্যুর ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আত্মহত্যা হিসাবে চিহ্নিত করলেও আমার বিবেচনায় এটি হত্যা। একজন মানুষকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে, প্ররোচনা দিয়ে, নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ‘জীবন’ কে শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, সেটি স্রেফ হত্যাকান্ড। খুনি সরাসরি তাকে গলা টিপে হত্যা করলো, নাকি ভিকটিম নিজে গলায় ওড়না পেচিয়ে তার জীবন শেষ করলো, এটা কিছু ভেরি করে না। একটা জীবন শেষ হয়ে গেলো এটাই বাস্তবতা।

মুনিয়াদের জীবন দর্শন এমন হবার দায় কার?? এই অসুস্থ সমাজের!! এই সমাজকে অসুস্থ করে তোলার দায় কার?? লুটেরা পুঁজিবাদের। এদের প্রতিনিধিত্ব করে ‘বসুন্ধরার’ মতো লুটপাটকারীরা। যাদের লুটপাটের সীমা-পরিসীমা নেই, ভোগ-বিলাসের শেষ বলে কোন শব্দ নেই। এদের ভোগের বলি হতে হয় নিরীহ শ্রমিকদের, মুনিয়াদের আরো অনেকের। মুনিয়াদের জীবনযুদ্ধে পরাজয়ের দায় এই নষ্ট-পঁচা-গলা সমাজের। এই সমাজকেও কাঠগড়ায় তুলতে হবে। এই সমাজ যারা টিকিয়ে রাখে আমি তাদের প্রত্যেকের বিচার দাবি করি। জানি, এই রাষ্ট্রে-সমাজে সেটি সম্ভব নয়। সেজন্যই প্রত্যাশায় থাকি এক নতুন সমাজের।

লেখক : সাবেক সভাপতি বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় যুব পরিষদ


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 14
    Shares