শনিবার, ডিসেম্বর ৫

‘আউট অফ বক্স’ সেমিনারঃ প্রসঙ্গ কর্ণেল তাহের

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 42
    Shares

মাসুদ রানা ::

বাংলা-ইংরেজী মিলিয়ে একটি গুরুচণ্ডালীর নামের সেমিনার হয়ে গেলো গত বুধবার সন্ধ্যায় লণ্ডনের মন্টেফিওরি সেন্টারে। সেমিনারের শিরোনাম ‘‘কর্ণেল তাহেরঃ একজন ‘আউট অফ বক্স’ ভাবুক’’। এর আয়োজক ছিলো কর্ণেল তাহের সংসদ।

সেমিনারের আগেই সেমিনারের প্রবন্ধ ইমেইলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সেমিনারের সভাপতি মঞ্জুরুল আজিম পলাশ। এতে পূর্ব-পাঠের সুযোগ হয়েছিলো। এমনটিই করা উচিত। তা নাহলে সেমিনার হয় না। সেমিনারে সুচিন্তিত উপস্থাপনার উপর সুচিন্তিত আলোচনা করাই কাম্য। থুথু ছিটিয়ে চিৎকারের স্থান সম্ভবতঃ সেমিনার নয়।

সেমিনারের উপস্থাপিত প্রবন্ধই যেখানে প্রধান আকর্ষণ হওয়া উচিত, সেখানে একটি বাড়তি আকর্ষণ ছিলেন ‘প্রধান অতিথি’। কী করে বুঝাই, সেমিনারের প্রবন্ধ উপস্থাপক ছাড়া আর কোনও ‘প্রধান’ থাকেন না! তবুও সেদিনের সে-সেমিনারে একজন ‘প্রধান অতিথি’ ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের একজন সাংসদ। নাম মঈনুদ্দিন খান বাদল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সমূহের একটির কার্যকরী সভাপতি তিনি।

সেমিনারের সভাপতির পক্ষ থেকে দীর্ঘ ভূমিকার পর প্রবন্ধের লেখক ডঃ শাহেদুজ্জামান রীতি ভেঙ্গে তাঁর প্রবন্ধ পাঠ কিংবা ‘অডিও ভিস্যুয়াল’ উপস্থাপনার পরিবর্তে বরং আলোচনাই করলেন। অবশ্য, সেমিনার-পত্রের কর্মসূচিতে তাঁকে ‘মূল আলোচক’ হিসেবেই নির্দেশ করা হয়েছিলো।

সেমিনার-প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছেঃ কর্ণেল তাহের ছিলেন ‘আউট অফ বক্স ভাবুক’ – অর্থাৎ প্রচলিত চিন্তার বাইরে চিন্তক (যদিও বাংলায় ‘ভাবুক’ বলতে যা বুঝায়, তাতে ইংরেজি শব্দ ‘থিঙ্কার’-এর ঠিক অর্থ প্রকাশিত হয় না)। কীভাবে তিনি ব্যতিক্রম ছিলেন, তার নমুনা ঘটনা বা প্রবণতা হিসেবে প্রাবন্ধিক ৬টি বিষয় উল্লেখ করেছেন। খুব সংক্ষেপে এগুলো হচ্ছেঃ

প্রথমতঃ প্রচলিত দাবী-দাওয়া ভিত্তিক বিক্ষোভ-আন্দোলন থেকে শুরু করে অসহযোগ-আন্দোলনের চিন্তাকে অতিক্রম করে কর্ণেল তাহের শুরু থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যূত্থান সংঘটিত করে বাঙালী জাতির স্বাধীনতার কথা ভেবেছিলেন। এ-জন্যই তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এবং সময় মতো সেখান থেকে পালিয়েও এসেছিলেন।

দ্বিতীয়তঃ কর্ণেল তাহের নিজে প্রথাগত সেনাবাহিনীর অফিসার হওয়া সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধ-কালে শুধুমাত্র কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে অধিক হারে গেরিলা প্লাটুন তৈরী করে এবং এঁদেরকে রাজনৈতিকভাবে প্রশিক্ষিত করে মুক্তিযুদ্ধকে একটা গেরিলা যুদ্ধে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। প্রাবন্ধিকের দাবী হচ্ছে, “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জয় এসেছিলো গেরিলা কৌশলের মাধ্যমেই।”

তৃতীয়তঃ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে যে-বাঙালী সৈনিকেরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-কালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রূপে সংগঠিত হয়েছিলেন, কর্ণেল তাহের চেয়েছিলেন সেই বাহিনীকে একটি ‘পিপসল আর্মি’ বা গণবাহিনী রূপে গড়ে তুলতে। এ-বিষয়ে স্বাধীনতা উত্তরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে রূপান্তরের প্রস্তাব করে ব্যর্থও হয়েছিলেন। প্রাবন্ধিক কর্ণেল তাহেরের এই ধারণাকে “তৃতীয় বিশ্বের প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী সম্পর্কে এ-ধরনের ধারণাকে যুগান্তকারী” বলে দাবী করেন।

চতুর্থতঃ বাংলাদেশ সম্পর্কে কর্ণেল তাহেরের “উন্নয়ন” চিন্তা ছিলো নদী-ভিত্তিক। তিনি বলেছিলেন, “সোনার বাংলাদেশ গড়তে হলে” নদীকে ঘিরে কল-কারখানা, স্কুল-কলেজ গড়ে তুলতে হবে। তিনি লক্ষ করেছিলেন মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত রাস্তাঘাট করা হয়েছে নদীর আড়াআড়ি। এটিকে তিনি বন্যার একটি কারণ বলে মনে করেছিলেন।

পঞ্চমতঃ কর্ণেল শুরু থেকেই বাংলাদেশের বাম শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে একটি জাতীয় চরিত্র বিকশিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু “তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ হন তিনি” বলে জানিয়েছেন প্রাবন্ধিক। প্রাবন্ধিক আরও জানিয়েছে যে, প্রচলিত রাশিয়া-পন্থা ও চীন-পন্থার বাইরে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে চিহ্নিত করার কারণেই কর্ণেল তাহের জাসদে যোগ দিয়েছিলেন।

ষষ্ঠতঃ কর্ণেল তাহেরকে প্রাবন্ধিক “পঙ্গু মানুষ” হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন যে, তাঁর এই অবস্থা তাঁকে আটকাতে পারেনি। কর্ণেল তাহেরের এই গুণটিকেও তিনি ‘বিশ্বের ইতিহাসে বিরল’ বলে উল্লেখ করেছেন।

পরিশেষে প্রাবন্ধিক বলেছেন, “কর্ণেল তাহেরের কর্মকাণ্ড বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।” তিনি দাবী করেছেন, “সেপাই জনতার বিপ্লবের ব্যর্থতার গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন, প্রয়োজন সেখানে কর্ণেল তাহেরের ভূমিকার বিশ্লেষণও।”

কিছু অতি-কথন ও অতি-সরলীকরণ ছাড়া প্রাবন্ধিক ডঃ জামান ভালোই লিখেছেন কর্ণেল তাহের সম্পর্কে। প্রাবন্ধিকের কৃত অতি-সরলীকরণের মধ্যে রয়েছে “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জয় এসেছিলো গেরিলা কৌশলের মাধ্যমেই” দাবী। আর, অতি-কথনের মধ্য রয়েছে কর্ণেল তাহেরের “তৃতীয় বিশ্বের প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনী সম্পর্কে এ-ধরনের ধারণা যুগান্তকারী” এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে “বিশ্বের ইতিহাসে বিরল” দাবী।

সেমিনারে আলোচক হিসেবে নিমন্ত্রিত হয়ে প্রাবন্ধিকের প্রবন্ধের সারসংক্ষেপ করে কর্ণেল তাহেরের সপ্তম গুণটি যোগ করতে অনুরোধ করলাম তাঁকে। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথে শুধু নিজেকেই নয়, পরিবারের সবাইকে জড়িত করার নিশ্চিদ্র প্রয়াসও কর্নেল তাহেরের চরিত্রের একটি দিক, যা সত্যিই বিরল। বাংলাদেশে নিজের সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনকে বিপদ-মুক্ত দূরত্বে সরিয়ে রেখে বিপ্লবী হবার চেষ্টা অনেকের মধ্যেই লক্ষ্য করা গিয়েছে। কিন্তু কর্নেল তাহের তা করেননি। তিনি নিজে যা বিশ্বাস করেছেন, তা অনুসরণ করতে তিনি তাঁর পরিবারের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

সুখের কথা, প্রাবন্ধিক ডঃ জামান এই সংযোজন সাদরে গ্রহণ করেছেন বলে তাঁর সমাপনী বক্তব্য জানিয়েছেন। কর্ণেল তাহের সম্পর্কে প্রসংশার পাশাপাশি ও কিছু সমালোচনা উপস্থাপন করেছিলাম সেদিনের সেই সেমিনারে, যা মোটামুটি নিম্নরূপ।

মনোবিজ্ঞানে মানুষের তিনটি দিক অনুধ্যান করা হয়, যার ইংরেজি নাম হচ্ছে (১) কগনিশন, (২) এ্যাফেকশন বা ইমোশন ও (৩) এ্যাকশন বা বিহেভিয়ার। বাংলায় বললে বলা যায়, বোধ, আবেগ ও আচরণ।

মানুষে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যে সংবেদন পায়, তা তার সামাজিক অবস্থান, জীবনাভিজ্ঞতা, আকাঙ্খা, প্রেষণা, ইত্যাদির আলোকে বোধের তৈরী করে। এই বোধ থেকে তাঁর মধ্যে তৈরি হয় দেহ-মনোগত বিশেষ পরিস্থিতি বা আবেগ। আর, এই বোধ ও আবেগই নির্ধারণ করে তাঁর কর্ম বা আচরণ।

একটি শিশু পথের ধারে পড়ে কাঁদছে দেখে পথচারীর মধ্যে একটি বোধের তৈরী হবে, যা তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা, অবস্থান, আকাঙ্খা, প্রেষণা ইত্যাদির আলোকে অবয়ব পাবে। সেই বোধ যদি তাঁর মধ্যে ইতিবাচক আবেগ তৈরী করে, তাহলে তিনি শিশুটির সাহায্যে এগিয়ে আসবেন। আর যদি ইতিবাচক আবেগ তৈরী না হয়, তা হলে পথচারীটি হয়তো না-দেখার ভান করে চলে যেতে পারেন।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের যে দুঃখ-দুর্দশা, তার নিরেখে কর্ণেল তাহেরের মধ্যে যে-বোধ তৈরী হয়েছিলো, তা ছিলো নিঃসেন্দেহে বৈপ্লবিক। অর্থাৎ, কোনো জোড়াতালি দিয়ে নয়, বরং সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তিনি সমস্যার সমাধান চেয়েছিলেন।

তাঁর আবেগের জায়গাটুকু ছিলো বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির ইতিহাসে উদাহরণ দেবার মতো। “নিঃশঙ্ক চিত্তের চেয়ে জীবনে আর কোনো বড়ো সম্পদ নেই” বলে তিনি যে-অমর বাণী উচ্চারণ ও তা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছেন, তার যে-আবেগগত মূল্য, তা মেপে বলার বিষয় নয়। আমাদের প্রজন্মের অনেকের জীবনের মন্ত্র হয়ে গিয়েছিলো কর্ণেল তাহেরের এই উচ্চারণ।

আচরণের ক্ষেত্রে কর্নেল তাহের তাঁর বোধ ও বিশ্বাসের বাইরে থাকেননি। সেনা অফিসার হিসেবে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়াই হোক, আর নিজের মতো করে কুমিল্লা সেনানিবাসে সেনাবাহিনীকে ভিন্ন ধাঁচে গঠন করাই হোক, কিংবা ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বরে ‘সিপাহী জনতার বিপ্লব’ই হোক, তিনি ভাবনা নিয়ে বেকার বসে আস্ফালন করেননি। তিনি কর্মবীর ছিলেন। কাজের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছেন।

তবে, আমরা যদি ভালো করে লক্ষ করি, তাহলে দেখবো, কর্ণেল তাহের ‘এ্যাফেকশন’ ও ‘এ্যাকশন’-এর ক্ষেত্রে সুচারু থাকলেও, বোধের ক্ষেত্রে কিছু ভুল করেছিলেন। ভুল মানে ভুল। ভুল মানে ত্রুটি নয়।

তাঁর প্রথম ভুল হচ্ছে, ‘পিপলস আর্মি’ সম্পর্কিত ধারণায়। বাংলাদেশ আর্মি হচ্ছে পাকিস্তান আর্মির একটি ভগ্নাংশ। জাত্যাভিমানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যে-বাঙালী সেনাগণ পাকিস্তানী আর্মি থেকে বিদ্রোহ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের পক্ষে কখনও পিপলস আর্মি হয়ে গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। কারণ, তাঁদের প্রশিক্ষণ, দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে যে-সামরিক প্রতিষ্ঠান থেকে, তার ভিত্তি হচ্ছে গণ-নিষ্পেষণ-মূলক রাষ্ট্র। এমনকি এটি এসেছে ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য থেকে, যা কর্ণেল তাহেরও বলে গিয়েছেন। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোকে ঠিক রেখে যেমন সমাজতন্ত্র গড়া যায় না, তেমনি প্রথাগত সেনাবাহিনীকে বিলুপ্ত না করে পিপলস আর্মি গড়া যায় না। পিপলস আর্মি গড়ে ওঠে জনগণের মধ্যে থেকে লড়াই করা সশস্ত্র মানুষদের নিয়ে।

কর্ণেল তাহের দ্বিতীয় ভুল, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান শ্রেণীসমূহের চরিত্র এবং পারস্পরিক সম্পর্কে না-বুঝতে পারা। এ-বিষয়ে তাঁর বৈজ্ঞানিক ধারণা থাকলে, তিনি পিপলস আর্মি গড়তে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে আবেদন কিংবা বিপ্লব করার জন্য জিয়াউর রহমানের উপর ভরসা করতে পারতেন না। স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-যে একটি বুর্জোয়া রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর নেত্বেত্বদানকারী শ্রেণী যে বুর্জোয়া শ্রেণী, তার সঠিক বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি কর্নেল তাহেরের ছিলো না।

কর্ণেল তাহের তৃতীয় ভুল হচ্ছে, সামাজিক বিপ্লবে বিপ্লবী দলের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে না পারা। তিনি জাসদে ছিলেন বটে। কিন্তু জাসদের রাজনৈতিক লাইন যা, ‘আমরা লড়ছি শ্রেণী সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য’ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূর্ত, সে লাইন তিনি ও জাসদ স্বয়ং ত্যাগ করে সামরিক অভ্যূত্থানের মাধ্যমে বিপ্লবের পথে গিয়েছেন। ফলে, সেনানিবাসে বিদ্রোহ হয়েছে, কিন্তু সারা দেশে জনগণ অসম্পৃক্ত থেকে গিয়েছে। আর এই ফাঁকে সম্পন্ন হয়েছিলো একটি প্রতিবিপ্লব।

কর্ণেল তাহেরের চতুর্থ ও মারাত্মক ভুল হচ্ছে সামাজিক বিপ্লবে রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে। যে-তাহের স্বাধীনতা যুদ্ধ-কালে ‘শুধুমাত্র শ্রমিক-কৃষক’ নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ করতে চেয়ছিলেন, তিনি সেনাবাহিনীতে চাকুরীরত সৈনিকদের ‘বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি’ মনে করে ভুল করছেন। জাসদের রাজনৈতিক তত্ত্বে যেখানে বলা হয়েছিলো বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী শ্রেণী হচ্ছে শ্রমিকেরা, যারা কৃষক-ক্ষেতমজুরদের সঙ্গে দৃঢ় মৈত্রীর ভিত্তিতে এবং মধ্যবিত্তকে দুদোল্যমান মিত্র হিসেবে ধরে রেখে বুর্জোয়া শ্রেণীকে রাষ্ট্র-ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করবে, সেখানে কর্নেল তাহের তাঁর ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে শ্রেণীর বিষয়টি সম্পূর্ণ গুলিয়ে ফেলেছিলেন।

কর্ণেল তাহেরের পঞ্চম ভুল হচ্ছে মিত্র চিহ্নিত করণের ক্ষেত্রে। জিয়াউর রহমানকে ‘কমরেড’ মনে করে, তাঁকে হাস্যকরভাবে ‘ছোটোদের রাজনীতি’ পড়তে দিয়ে (এই কাহিনীটি আমাকে লণ্ডনে বলেছিলেন হারুন হাবীব) কর্ণেল তাহের অত্যন্ত দুর্বল রাজনৈতিক বোধের পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি জীবন দিয়ে তাঁর ভুলের মূল্য দিয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে বাঁচার জন্য তিনি জিয়াউর রহমানের কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি। এখানেই কর্ণেল তাহেরের মহত্ত্ব। তিনি নিঃসন্দেহে একজন বীর।

আমাদের কাছে প্রেরণাদায়ক হচ্ছে কর্ণেল তাহেরের ‘এ্যাফেকশন’ ও ‘এ্যাকশন’। কিন্তু তাঁর ‘কগনিশন’ বা বোধের জায়গায় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ভুল থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তবেই কর্ণেল তাহেরের আত্মত্যাগের যথার্থ মর্ম উপলব্ধি ও তাঁর প্রতি সম্মান দেখানো হবে।

লেখক : সাবেক ছাত্র নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 42
    Shares