শনিবার, নভেম্বর ২৮

অ্যান্টিবডি টেস্ট ছাড়াই দেওয়া হচ্ছে প্লাজমা, উদ্দেশ্য শুধুই ব্যবসা

এখানে শেয়ার বোতাম

অধিকার ডেস্ক:: সুনির্দিষ্টভাবে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীকে সুস্থ করে তোলা নয় বরং সুস্থ হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করা প্লাজমা থেরাপি আশার আলো দেখিয়েছিল। গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করে ভালো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে—এমন আশায় এর প্রতি ঝোঁকও বেড়েছিল। তবে দিনে দিনে সে ঝোঁক ব্যবসার দিকে রূপ নিচ্ছে, মানা হচ্ছে না কোনও নিয়ম-নীতি।

এমনকি সর্বোচ্চ দুই ব্যাগ প্লাজমা দেওয়া যায় বলে চিকিৎসকরা জানালেও ব্যবসার উদ্দেশে কোনও কোনও চিকিৎসক পাঁচ ব্যাগ প্লাজমা দিতে হবে বলেও রোগীর স্বজনদের জানাচ্ছেন। প্লাজমা দেওয়ার জন্য অ্যান্টিবডি টেস্ট করা আবশ্যক হলেও অ্যান্টিবডি টেস্ট ছাড়াই প্লাজমা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি নন-কোভিড রোগী থেকেও প্লাজমা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রক্তের তরল, হালকা হলুদাভ অংশকে প্লাজমা বা রক্তরস বলে। তিন ধরনের কণিকা ছাড়া রক্তের বাকি অংশই রক্তরস। মেরুদণ্ডী প্রাণীর শরীরের রক্তের প্রায় ৫৫ শতাংশই রক্তরস। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশে প্লাজমা থেরাপির মাধ্যমে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্লাজমা থেরাপিকে শুধু পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর্যায়ে রাখার জন্য বলে একটি অন্তর্বর্তীকালীন গাইডলাইন দিয়েছে। যেখানে একে ‘ইনভেস্টিগেশনাল থেরাপিউটিকস’ বলা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এটা সব রোগীর ওপর নিশ্চিতভাবে কাজ করছে এমন প্রমাণ নেই। জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা বলেন, এখনও আমাদের নিজেদের কোনও গাইডলাইন নেই, করোনাভাইরাসের সব চিকিৎসাই এখনও পরীক্ষামূলক। প্লাজমা থেরাপিও তার ব্যতিক্রম নয়।

দেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়া প্লাজমা থেরাপি না দিতে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সুপারিশ থাকলেও সেটা মানা হচ্ছে না। নেই কোনও মনিটরিং সিস্টেম। যে কারণে চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে চলছে প্লাজমা ব্যবসা।

চিকিৎসকরা বলছেন, বলার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত নেই যে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় প্লাজমা থেরাপি ইফেক্টিভ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও প্লাজমা থেরাপি রিকমেন্ড করেনি। কিন্তু তারপরও কিছু কিছু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা কাজ করে।

অভিযোগ উঠেছে, প্লাজমার ওভার ইউজ হচ্ছে দেশে। কিন্তু চিকিৎসকদের কোনও অধিকার নেই প্রেসক্রাইব করার আগে সেটা ব্যবহার করা, যা কিনা দীর্ঘমেয়াদে গিয়ে কোনও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে মারা যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং আর কোনও অপশন হাতে নেই এমন রোগীকে প্লাজমা দিয়ে দেখা যেতে পারে। একে বলা হয় ‘কমপেসনেট গ্রাউন্ড বা রিজন’। আর সেটা কোনোভাবেই ভিত্তিহীন হওয়া যাবে না।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমান বলেন, দুই রকমের অ্যান্টিবডি তৈরি হয় শরীরে। প্লাজমা দিতে হবে করোনা থেকে সেরে ওঠার চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর। তবে এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় জড়িত মন্তব্য করে অধ্যাপক রিদওয়ানুর রহমান বলেন, কিন্তু এতে ‘এক্সপেকটেড বেনিফিট’ পাবার সুযোগ নেই যদি সব ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করে না দেখা হয়। আর এজন্য আমাদের দেশে বাইন্ডিং অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভর করে যে প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হচ্ছে, এতে রোগীর কোনও উপকার নাও হতে পারে। এমনকি এটা তার জন্য ক্ষতিকরও হতে পারে। তার মতে, এখন ক্ষতিটা বোঝা না গেলেও হয়তো এক বছর পর কিংবা আরও বেশি হলে পাঁচ বছর পর বোঝা যাবে।

তিনি বলেন, আর এসব কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা রিকমেন্ড করতে পারছে না। তাই এটা একটা ‘ডাউটফুল’ বিষয়। একে কোনোভাবেই ওভার ইউজ করা যাবে না, একে রেস্ট্রিকটেড ইউজ করতে হবে, গাইড লাইন রিকমেন্ডেড হতে হবে।

অধ্যাপক রিদওয়ানুর বলেন, দুনিয়ার কোথাও র‌্যান্ডমলি প্লাজমা ব্যবহার হচ্ছে না যেটা বাংলাদেশে হচ্ছে। সেটা কোনও না কোনও কারণে হচ্ছে। কিন্তু কোনও নিশ্চয়তা নেই যে এটা রোগীকে ভালো করবে, আর যদি নিশ্চয়তা থাকতো আমেরিকাতে দুই লাখ মানুষ মারা যেতো না।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ খুব সক্রিয়। একইসঙ্গে যারা করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন তারা অনেকেই প্লাজমা দিতে আগ্রহী হয়েছেন। ফেসবুকে প্লাজমা দেবার বিষয়ে অনেক গ্রুপ হয়েছে। দেশের বড় বড় বেসরকারি করপোরেট হাসপাতাল থেকে যখন প্লাজমার জন্য ডিমান্ড আসে, তখন ফেসবুকের সেসব পেজ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্লাজমা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু করোনাতে আক্রান্ত হয়ে যাদের মাইল্ড সিম্পটম থাকে তাদের শরীরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবডি হয় না এবং হলেও পরিমাণ খুব কম, যেটা দিয়ে আসলে আরেকজনের কোনও উপকারের সম্ভাবনা থাকে না। যে কারণে যারা মডারেট টু সিভিয়ার রয়েছেন, তাদেরকে দেখে নিতে হয় যে অ্যান্টিবডি কতটুকু রয়েছে। কিন্তু সেটা না করে প্লাজমা দেওয়ার বিধান কোথাও নেই। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক, রাজধানীর প্রথম সারির বেসরকারি করপোরেট হাসপাতালগুলোতে একদিনের জন্য অ্যান্টিবডি টেস্ট করে নাই, তারা প্লাজমা দিয়ে দিচ্ছে রোগীদের থেকে র‌্যান্ডমলি নিয়ে।

এই চিকিৎসক নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অভিযোগ করে বলেন, দেশের বড় বেসরকারি হাসপাতাল থেকে কেবল চিকিৎসকরা নিজেদের পরিবার এবং ভিআইপির যদি প্রয়োজন হয় তখন তার কাছে প্লাজমার জন্য জানান কিন্তু কোনও সাধারণ রোগীর ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। তিনি বলেন, তার মানে যখন নিজেদের জন্য দরকার হচ্ছে তখন যেসব জায়গাতে অ্যান্টিবডি টেস্ট করে প্লাজমা দেওয়া হচ্ছে সেসব জায়গা থেকে সংগ্রহ করছেন কিন্তু রোগীদের দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও কোয়ালিটি এসব হাসপাতালে মেনটেইন হচ্ছে না। আর অ্যান্টিবডি যখন দেখা হয় না, তখন সেটা নরমাল প্লাজমা হয়ে যায়, এটা কোনোভাবেই প্রমাণ করা যাবে না যে এটা কোভিড রিকভার্ড প্লাজমা। আমরা প্রায়ই নন-কোভিড প্লাজমা নিয়ে আসা রোগীর স্বজনদের পাই।

তিনি আরও বলেন, এমনকি দুই ব্যাগ প্লাজমা দেওয়ার দরকার না হলেও হাসপাতাল থেকে পাঁচ ব্যাগ প্লাজমা দিচ্ছেন—এর আদৌ কোনও ভিত্তি নেই, সম্পূর্ণ ব্যবসার উদ্দেশ্যে এটা করা হচ্ছে। একেক ব্যাগ প্লাজমার দাম নেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার টাকা কমপক্ষে, পাঁচ ব্যাগ প্লাজমা থেকে নিদেনপক্ষে এক লাখ টাকা ব্যবসার সুযোগ রয়েছে। অথচ দুই ব্যাগের বেশি প্লাজমা সারাবিশ্বে কোথাও ব্যবহারের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তাই এটা বাংলাদেশের কোভিড বিষয়ক গাইডলাইনেও থাকা উচিত।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, অ্যান্টিবডি টেস্ট না করে প্লাজমা দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। তাছাড়া এক্ষেত্রে শুধু অ্যান্টিবডি আছে কিনা সেটা দেখলে হবে না, কী পরিমাণ আছে সেটাও দেখতে হবে। শরীরে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অ্যান্টিবডি তৈরি না হলে প্লাজমা দিয়েও কোনও ফল পাওয়া যাবে না।


এখানে শেয়ার বোতাম