বুধবার, ডিসেম্বর ২

অবক্ষয়ের বৃত্ত ভেঙে- উড়াও মুক্তির পতাকা!

এখানে শেয়ার বোতাম

আল কাদেরি জয় ::

শিক্ষার অধিকার মানবিক।প্রকৃতির প্রতিকূলতা ও সমাজের নানা অসঙ্গতি মোকাবেলা করতে গিয়ে মানবজ্ঞানের উম্মেষ ঘটে। মানুষ হয়ে উঠে সভ্য, আধুনিক ও সৃজনশীল।তাই মানুষ হিসেবে প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে শিক্ষার অধিকার।শিক্ষা বিশ্বাসের অন্ধত্ব ও কুসংস্কার এবং অজানার অসহায়ত্ব ঘুচিয়ে মানুষকে ক্রমাগত উন্নত করে গড়ে তোলে। এই মানবিক ও মৌলিক অধিকার অর্জনে এদেশের ছাত্রসমাজের লড়াই দীর্ঘদিনের।যুগে যুগে জনগণের এই অধিকারের কথা অস্বীকার করে শাসকগোষ্ঠী প্রতি পদে তৈরি করেছে বৈষম্য ও বঞ্চণার দেয়াল।তারা শিক্ষাকে করেছে বাণিজ্যিক, সাম্প্রদায়িক ও খন্ডিত; এর মর্মবস্তু নষ্ট করে সার্টিফিকেট আদায়ের সুযোগ হিসেবে বানিয়েছে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার ব্যয় বেড়ে চলেছে এবং বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে উঠেছে মূলধারা।

অন্যদিকে গবেষনা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ হারিয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্য ও ক্ষমতা প্রদশর্নের ক্ষেত্র। এরকম সংকটজনক পরিস্থিতিতে ছাত্র আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ধারা শক্তিশালী করতে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাজেয় বাংলায় ও রাজু ভাষ্কর্যে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ৫ম কেন্দ্রীয় সন্মেলন অনুষ্ঠিত হবে ।

আমরা যে সমাজে বাস করি তা শ্রেনীবিভক্ত সমাজ। শোষক ও শোষিত শ্রেণিতে বিভক্ত এই সমাজে দুই ধরনের গতি থাকে- একটা প্রগতির দিকে অর্থাৎ সামনের দিকে,আর একটা প্রতিক্রিয়ার অর্থাৎ পিছনের দিকে। শাসক পুঁজিপতিশ্রেণী চায় সমাজকে পিছনের দিকে টেনে রাখতে।কারণ সমাজের অগ্রগতি বা বিকাশ যদি স্বাভাবিকভাবে অগ্রসর হতে থাকে তাহলে তাদের শ্রেণীর স্বার্থ ক্ষয় ও বিনাশের দিকে যাবে।সেজন্য তাদের মুনাফার উদ্দেশ্যে সমাজের সবকিছু মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে কুক্ষিগত করতে চায়।আইন,বিচারব্যবস্থা,প্রশাসনকে গোষ্ঠীস্বার্থে কাজে লাগাতে চায়। জনগণের শিক্ষা,স্বাস্থ্য,কাজের অধিকারসহ বেঁচে থাকার সমস্ত রাস্তাকে সংকুচিত করতে চায় তাদের মুনাফার স্বার্থে। এইজন্য তারা তাদের শ্রেণী ও কায়েমী স্বার্থের পক্ষে ধরে রাখতে জনগণকে অশিক্ষা-কুশিক্ষার বেড়াজালে আটকে রাখে। জনগণের নিজস্ব অধিকার ও প্রতিরোধের শক্তি ধসিয়ে দিতে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনগণের চেতনার মান নামিয়ে দিতে চায়। এভাবে শাসকগোষ্ঠী প্রগতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করে, শোষন-শাসনের কর্তৃত্ব বহাল রাখতে চায়।

অন্যদিকে যারা এই অবস্থা ও ব্যবস্থা পাল্টাতে চায় অর্থাৎ শোষণমুক্ত সমাজ,জীবনের সর্বমুখী বিকাশকে অবারিত করতে চায় তাদেরকে প্রগতির পথের সন্ধান করতে হয়। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লড়তে হয়। এখানেই শাসকরা চায় জনগণকে বিভক্ত করতে আর জনগণের প্রয়োজন হয় ঐক্যবদ্ধ শক্তি নিয়ে এগুতে। ছাত্র ফ্রন্টের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আমরা জনগণের এই ঐক্যের শক্তিকে নির্মাণ করতে চাই।

আজ বানিজ্যিকীকরণের সর্বমুখী আক্রমণ নেমে এসেছে শিক্ষার উপর। স্কুল শিক্ষাকে ধ্বংস করে জিম্মি করা হয়েছে কোচিং ব্যবসায়ীদের কাছে। সৃজনশীল পদ্ধতির নামে গাইডবই,ডোনেশন প্রথা, প্রশ্নপত্র ফাঁস নিত্তনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর A+ পাওয়া শিক্ষার্থীর পরিমাণ বাড়লেও ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারার ঘটনায় বোঝা যায় শিক্ষার মান আজ কোথায় নেমে পড়েছে?

উচ্চ মাধ্যমিক কলেজগুলোতে নেই পর্যাপ্ত আসন, শিক্ষক, লাইব্রেরি-ল্যাবরেটরীর সুযোগ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজসমূহে সেশনজট,পরীক্ষার রেজাল্টের দীর্ঘসূত্রিতা এবং ক্রাশ প্রোগ্রামের নামে ছাত্র ঝড়ে পড়ার ভীতিকর চেহারা বিদ্যমান।পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হল-ডাইনিংসহ আবাসন এবং শিক্ষা গবেষণা খাতে বাজেট কমলেও থেমে নেই ইভেনিং ও উইকএন্ড কোর্সের ফি’র বৃদ্ধি ।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একবেলা পাবলিক ও একবেলা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে।এ বছরের জিডিপিতে শিক্ষাখাতে বাজেট দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন বরাদ্দ হয়েছে বাংলাদেশে।এখাতে বরাদ্দ ১৬.৭৫ % দেখালেও ২৮ টা মন্ত্রণালয়ের ট্রেনিংখাতসহ যুক্ত বাস্তবে বরাদ্দ হয়েছে ১১.৬৮%। এই যখন শাসকশ্রেণীর শিক্ষার তথাকথিত উন্নয়নের নমুনা(!) তখন বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্রদের অসন্তোষ ও প্রতিবাদ রুদ্ধ করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের দখলদারির মহড়া। গেস্টরুম-গণরুমের নির্যাতনের চেহারা দেখলে শিউরে উঠতে হয়।

শিক্ষার এই সকল সংকট ও দূর্ষহ চেহারা দেখে ছাত্রসমাজ কি প্রতিবাদ করবে না? নিরবে সয়ে নেবে চোখের সামনে এসকল অন্যায় ও নিপীড়ন?

প্রকৃতিবিজ্ঞানের নিয়মের বাইরে যেমন প্রকৃতির কোনো ঘটনা ঘটতে পারে না, তেমনি সমাজের প্রতিটি বিষয়ই সমাজবিজ্ঞানের নিয়ম না মেনে চলতে পারে না। রাজনীতি তেমনি এক বিজ্ঞান যা সমাজের পরিচালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে।ইঞ্জিনের গতি যেমন ট্রেনের সব বগিকে টেনে নিয়ে যায়,তেমনি রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে সমাজের সবকিছু পরিচালিত হয় ; মানুষের নীতি-নৈতিকতা,আদর্শ, মূল্যবোধ সবকিছুই নির্দ্ধারিত হয়।তাই কেউ চাইলেও এই রাজনৈতিক পরিসীমার বাইরে যেতে পারে না। তাকে শাসকদের রাজনীতি মেনে নিতে হয় অথবা শোষিতের পক্ষে দাঁড়াতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হয় কিংবা অন্যায়কে মেনে নিতে হয়। নিয়মশাসিত জগতে তাই নিয়মের বাইরে যাওয়া যাবে না। তরুণ-যুবকদের ভালোমন্দের কার্যকারণ এখানেই নিহিত থাকে। সমাজ বিকাশের যে ধারা তার সাথে যুক্ত হলে জীবন বিকশিত হবে আর অবক্ষয়ী ধারার সাথে যুক্ত হলে জীবন অবক্ষয়ের দিকে যাবে।

মুনাফাভিত্তিক এই পুঁজিবাদী সমাজে শাসকরা চায় জনগণকে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত করে রাখতে। ব্যক্তিস্বার্থ,লোভ-মুনাফা,ধর্ম,সাম্প্রদায়িকতা, আঞ্চলিকতা, জাতপাত প্রভৃতির মাঝে তার বিবেক মূল্যবোধকে আটকিয়ে রাখতে চায়।অন্যায় শাসন পরিচালনা করার জন্য যে রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি বা যে বিধি-বিধান তৈরি করে রেখেছে ছাত্রসমাজকে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দিতে চায় না।তাই প্রচলিত সমাজের বিরুদ্ধে যৌবনের প্রতিবাদের শক্তিকে ধসিয়ে দিতে শাসকশ্রেণী সমাজে মাদক,পর্ণোগ্রাফি,সন্ত্রাস প্রভৃতি অনৈতিক কর্মকান্ড ছড়িয়ে দেয়। মানবজাতির সমস্ত অতীত অর্জন ,মানবিকতা ও সৃষ্টিশীলতাকে ধসিয়ে দিতে চায় মুনাফার নিগড়ে।নিজেরাই হয়ে উঠে পুঁজিবাদী দুনিয়ার সবচে বড় ধ্বংসকারী!

আজ তাই এই ধ্বংসের হাত থেকে,এই অবক্ষয়ের থাবা থেকে নিজেকে ও মানবজাতিকে রক্ষার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে হবে। শিক্ষার আন্দোলনকে সমাজপ্রগতির লড়াইয়ে পরিণত করা ছাড়া এই অধিকার পূরণ সম্ভব নয়।সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যৌবনের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। একদিন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে যেভাবে সূর্যসেন,প্রীতিলতা,ভগত সিং, আশফাক উল্লাহ, রুমি,আজাদ, মতিউরের রক্তে দ্রোহে মুক্তির সূর্য উঠেছিল, তেমনি আজ এই শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট জনগণকে আবারও গায়তে হবে সাম্যের গান, লড়াইয়ের শ্লোগান!

সেই লক্ষ্যে আসুন আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ৫ম কেন্দ্রীয় সন্মেলনকে সফল করে তুলি…

লেখক: আল কাদেরি জয়, আহবায়ক , ৫ম কেন্দ্রীয় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট
( লেখকের ফেইসবুক থেকে নেওয়া)


এখানে শেয়ার বোতাম