রবিবার, জানুয়ারি ১৭

অনুজপ্রতীম বন্ধু মুনীরুজ্জামান স্মরণে

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 185
    Shares

শেখর দত্ত ::

মুনীর, দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান আর আমাদের মাঝে নেই। মুনীরের শরীর ভালোর দিকে জেনে গত রাতে খাবারের টেবিলেও আমরা দুজনে বলাবলি করছিলাম, সে ভালো হয়ে যাবে। স্বাস্থ্যটা ওর সবল। কিন্তু তখন কে জানতো বারো ঘন্টা পার না হতেই মুনীর চলে যাবে। আজ বেশ সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় গড়াগড়ি দিতে দিতে পত্রিকার কলামে কি লিখবো ভাবছিলাম। তারপর যথারীতি কম্পিউারের সামনে বসে লিখছিলাম। সকালের পথ্যসহ চা খাওয়া শেষ। এমন সময় আভার চিৎকার । উঠবো ভাবছি। কি হলো! দৌড়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়েই আভা বললো, মুনীর নেই…। আভার সহপাঠী ও একান্ত বন্ধু মুনীর। আমাকে সে কি প্রবোধ দিবে! আমিই ওকে সামাল দিলাম।

ষাটের দশকে আমরা যখন ছাত্র আন্দোলন-সংগঠনে ডুবে আছি, তখন আমাদের ছিল দুই মুনীর। জে মুনীর আর ডি মুনীর। সিরাজুম মুনীর জগন্নাথ কলেজে আর মুনীরুজ্জমান ঢাকা কলেজে পড়তো। পরিচিতির জন্য নামের আগে কলেজের আদ্যক্ষর বিশেষণ হিসাবে যুক্ত হয়েছিল। সিরাজুম মুনীর মুক্তিযুদ্ধের শহীদ আর মুক্তিযোদ্ধা মুনীর আজ চলে গেল। মৃত্যুর খবর শুনে দুই মুনীরকে নিয়ে যখন ভাবছি , তখন মনে হলো সিরাজুম মুনীর যে কবিতা লিখতো, তা সে শহীদ হওয়ার আগে জানতাম না। আর মুনীরুজ্জামান যে শেষ পর্যন্ত একটা দৈনিকের সফল সম্পাদক হবে, এত সহজভাবে গভীরতা নিয়ে রাজনীতি ও সমাজের কথা লিখবে-বলবে , তা তখন বুঝতেও পারি না। এত কাছে, এত মেলামেশা, এত খাতির; তবুও বুঝতে-জানতে পারি নাই তখন ওদের গুণাবলী।

গভীর শোক সাগরে হাবুডাবু খেতে খেতে বহু প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে ভাবলাম, এত কাছের সহযোদ্ধাদের গুণাবলী তখন জানতে পারিনি কেন? যদি জানতাম, তবে কি বন্ধুত্ব আর সৌহার্দ্যরে জায়গাটা আরো গভীর ও দৃঢ় হতো না! আসলে একজন মানুষ অপর জনের সবটা কাছে থেকেও জানতে -বুঝতে পারে না। ‘ আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না।..’ নিজেকেই মানুষ জানতে পারে না। অপরকে পারবে কি? কেন পারে না- মুনীরের মৃত্যু এই শোকের সকালে আমাকে আরো বেশি করে এই প্রশ্নে মুখোমুখি করে দিয়ে গেলো।

১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়ন ভেঙে যায়। কঠিন সময় সংগঠনের। কিন্তু এই সালের এসএসসি পাশ করা ব্যাচটা ছিল ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠনের জন্য সত্যিই অনন্য। হবেইবা না কেন? বাষটি – চৌষট্টির ছাত্র- গণ অন্দোলন স্কুলে থাকতেই তাদের প্রভাবিত করেছে আর কলেজে ভর্তি হয়ে পেয়েছে ছেষট্টির ৬-দফা আন্দোলন। তখন চলছে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের জোয়ার। জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠই তো শ্রমিক-কৃষক মেহনতী মানুষ। জাতির মুক্তি মানে দেশের মুক্তি, জনগণের মুক্তি। এই স্বপ্ন মনে-প্রাণে, চোখে-মুখে। একঝাক স্বপ্নেবিভোর তড়িৎকর্মা ভালো ছাত্র যোগ দিল ছাত্র ইউনিয়নে। আরো সজীব-সতেজ হয়ে উঠলো ছাত্র ইউনিয়ন। তাদের সকলের তখনকার স্বপ্নদীপ্ত চেহারাগুলো মনে পড়লো। খন্দকার মুনীরুজ্জামান তাদেরই অগ্রভাগের একজন।

মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সেল উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে মুনীর ছাত্র সমাজের নেতা হয়ে ওঠে। ২ জুলাই ১৯৬৯ ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে মুনীর ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হয়। ওই সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের ভলেন্টিয়ার বাহিনী গঠনে মুনীরের ছিল অগ্রণী ভূমিকা। মুনীরের সাহস ছিল অপরিসীম। কথা ও কাজের অপূর্ব মিল। কর্ম ছিল ঠিক স্বপ্নের উপযোগী। নরম মনের সহকর্মী বৎসল সে। স্পষ্টভাষী। ভালো একজন সংগঠক ও প্রচারকের গুণ ছিল তার। ওইসব গুণই তাকে ছাত্র নেতৃত্বের পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

আজ সকালে মুনীরের কথা ভাবতে গিয়ে মনে পড়লো ১২ আগস্ট ১৯৬৯ এর দিনটির কথা। ইয়াহিয়ার দোসর নূর খানের শিক্ষাবিরোধী দেশবিরোধী শিক্ষানীতি ঘোষিত হয়েছে। ওই দিন সামরিক শাসনের মধ্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে ওই শিক্ষা নীতির প্রতিবাদে টিএসসিতে সেমিনার হচ্ছে। ডাকসুর সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ সভাপতি। অতিথি শহীদুল্লাহ কায়সার ও আবদুল গফফার চৌধুরী। বক্তৃতা শুরু করলেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সামসুদ্দোহা। হঠাৎই সরকারি মদদে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের লাঠিসোটা ও হকিষ্টিক নিয়ে আক্রমণ। অতির্কিত আক্রমণে সভা লন্ডভ-হয়ে যায়। ১৫-২০ মিনিট ওদের তা-ব চলে। তারপর শুরু হয় আমাদের পাল্টা আক্রমণ। কে এগিয়ে গেল সবার সামনে। আমাদের সাহসী মুনীর। জয়ী হলাম আমরা। মুনীর ছিল বিজয়ের প্রতীক। তখন থেকেই মুনীর আমাদের গর্ব।

অসহযোগ আন্দোলনের এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ময়দানে যখন রাইফেল ট্রেনিং শুরু হয়, তখনও সে ছিল ছাত্রকর্মীদের ট্রেনিং শিক্ষক। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি যখন আগরতলার বড়দোয়ালি গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনজিট ক্যাম্পের মূল দায়িত্বে, তখন মুনীর ছিল আমার একান্ত সহযোগী। ৬ জনের একটা টীমের মধ্যমণি ছিল মুনীর। মুক্তিযোদ্ধা হিসাবেও মুনীরের স্মৃতি ভোলার নয়। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পনের পরদিন সকালে আমরা একসাথে নবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় প্রবেশ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন্স এনেক্সে অস্থায়ী অফিস গড়ি। তখনও কমিউনিস্ট পার্টি বা ন্যাপ নেতৃবৃন্দ ঢাকায় আসেননি। মুনীর ছিল আমাদের ওই অস্থায়ী অফিসের সিকিউরিটির মূল দায়িত্বে। মনপ্রাণ দিয়ে তখন আমরা আইনশৃঙ্খলা সুরক্ষার কাজ করেছি। ওই দিনগুলোর স্মৃতি আর সেই সাথে স্বপ্ন ভুলবার নয়।

এক সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশে পুরানা পল্টনে বহুকাল পর কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য অফিস নেওয়া হলো। তখনও মুনীর ছিল আমার সাথী। অস্ত্র হাতে মুনীর প্রথম দিকে অফিস সিকিউরিটির দেখাশোনা করছিল। বিপ্লবের লক্ষ্যে কত কঠিন গুরুত্ব ও ঝুকিপূর্ণ কাজ যে তখন আমরা একসাথে করেছি। পার্টির সার্বক্ষনিক হওয়ার বিষয়টি ঠিক করতে মুনীরের কোনো সময় লাগেনি। একসময় সে পার্টির সিদ্ধান্তে যোগ দিল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে। নেতৃত্বের গুণাবলী আয়ত্ব করেছিল বলেই জ্ঞান চক্রবর্তীর মৃত্যুর পর এবং ওসমান গনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে চলে আসার পর মুনীর হয় কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা নগর কমিটির সম্পাদক।

রাজনীতি , রাজনৈতিক দল এক জটিল ব্যাপার। দল মানে রাজনীতি ও সংগঠন নিয়ে দলাদলি , টানাপোড়েন , পক্ষ-বিপক্ষ । যতটুকু মনে পড়ে মুনীর যখন ঢাকা নগরের সম্পাদক হয়, তখন আমি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠন বিভাগের প্রধান। নানা জটিলতার মধ্যে কখনও কাছে, কখনও দূরে এমনটা হয়েছে মুনীর আর আমার মধ্যে। কিন্তু কখনও মনোমালিন্যে পর্যবসিত হয়নি। সুদীর্ঘ দিন একত্রে থাকার কারণে আমরা একে অপরকে ঠিকই বুঝতাম। কমিউনিস্ট পার্টিতে নব্বুয়ের দশকে বিভক্তি এলে মুনীর রাজনৈতিক দল ছেড়ে দেয়। সাইফউদ্দিন মানিক জীবিত থাকতে মণি সিংহ -ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের বোর্ড মেম্বার হওয়ার অনুরোধ নিয়ে নুরুল ইসলাম নাহিদ ও আমি ওর কাছে গিয়েছিলাম। প্রথমে রাজি হয়েছিল। পরে সেই মত পরিবর্তন করলেও সে ছিল ট্রাস্টের আপনজন, সুহৃদ।

এক সময় মুনীর রাজনৈতিক দল করা ছেড়ে দেয় ঠিকই। কিন্তু শোষন- নিপীড়ন – ক্ষুধা-দারিদ্র-বেকারত্ম থেকে মুক্তির যে আকাঙ্খা ও স্বপ্ন সমাজতন্ত্র শব্দের ভেতর দিয়ে ষাটের দশকে আমরা অগ্রজ-অনুজ সহযোদ্ধা বন্ধুরা গ্রহণ করেছিলাম, তা মুনীর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধারণ করেছিল। আমার ও আভার একটা দুঃখ এই যে, আমাদের দুজনের লেখা ‘কালস্রোত’ বইটির প্রকাশনা উৎসবে মুনীরের আসার কথা ছিল। কিন্তু বিদেশ থাকায় সে উপস্থিত হতে পারেনি। পরে বইটি পড়ে সে আভা ও আমাকে টেলিফোন করেছে। দেখা হলে বইটি নিয়ে কথাও বলেছে।

মুনীরের বিষয়ে যখন লিখছি, তখন মনে পড়ছে রেখা-মুনীরের বিয়ের কথা। পরদিন বাসায় এক সাথে নিয়ম মেনে বিশাল এক থালায় সহযোদ্ধা বন্ধুদের নিয়ে একত্রে খেয়েছিলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কালিকচ্ছ এলাকায় ওর বাড়ি। মেধা-মননে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে প্রসিদ্ধ সেই এলাকা। কালিকচ্ছ নিয়ে বেশ গর্ব ছিল ওর। সাংগঠনিক কাজে ওই এলাকা গিয়েছিলাম। শুনে মুনীর বলেছিল আবার গেলে সেও সঙ্গে যাবে। বাড়ি গিয়ে দুজন থাকবো। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। রহস্যময় মানবজীবন।

মুনীর আমার চাইতে বয়সে ছোট। আমার এখন যা বয়স, তাতে বড় বা বন্ধু কারো মৃত্যু হলে শোকে ভেঙে পড়ি। সম্প্রতি বন্ধু ও সহযোদ্ধা আবুল হাসনাতের মৃত্যুর পর তেমনটা হয়েছিল। কিন্তু বয়সে ছোট কারো মৃত্যু হলে শোকের সাথে মনে খুব অস্থির হয়ে ওঠে। মনে হয় আমি আগে গেলেই তো পারতাম। কিন্তু মুনীরই আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। শোক আর অস্থিরতা কোথায় রাখবো। মুনীর বেঁচে থাকবে তার সংগ্রামী জীবনের মধ্যে, লেখার মধ্যে, কথার মধ্যে।

প্রয়াত মুনীরের স্মৃতির প্রতি জানাই রক্তিম শ্রদ্ধা।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 185
    Shares