রবিবার, মে ১৬
শীর্ষ সংবাদ

অধ্যাপক মোজাফফর প্রগতির পথিকৃৎ

এখানে শেয়ার বোতাম

মনজুরুল আহসান খান ::

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে জীবিত পথিকৃৎ। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই রাজনীতিতে তার দীপ্ত পদচারণা। সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে ধর্মীয় উন্মাদনার মধ্যে প্রগতির পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়াটা সহজ কথা নয়। প্রবল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে মানবতাবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং বিশ্বপরিমণ্ডলে মুক্তির বাণী ছড়িয়ে দেয়ার কাজে আজীবন নিয়োজিত ছিলেন অধ্যাপক মোজাফর আহমদ। তার বয়সের প্রজন্মকে পাকিস্তানি চিন্তাধারা থেকে বের করে নিয়ে মুক্ত ও আধুনিক চিন্তার ধারায় নিয়ে আসেন। তার বয়সের লোকজন সরকার, প্রশাসন ও বেসরকারি সবার সঙ্গে এবং শিক্ষক সমাজের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এছাড়া সাধারণ মানুষ, গ্রামের কৃষক ও গরিব মানুষের সঙ্গে ছিলো তার আন্তরিক সম্পর্ক। অধ্যাপক সাহেব সাধারণ মানুষের সঙ্গেই তাদের ভাষায় কথা বলতে পারতেন। তিনি বলতেন, ‘আমি মোজাফফর আহমদ নূরী, ক্ষেতের আইলে আইলে ঘুরি’। আসলে গ্রামগঞ্জে ছিল তার অবাধ বিচরণ। হাস্যরস মেশানো তার বক্তৃতা ছিল খুবই উপভোগ্য।

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার ব্যাপারে তার বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে বেঈমানি করলে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গড়ে তোলেন। পরে মওলানা ভাসানী চীন-মার্কিন সম্পর্ক এবং আইয়ুব-ভুট্টোর দূতিয়ালির পরিপ্রেক্ষিতে ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব আইয়ুবনীতি’ গ্রহণ করলে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সভাপতি হিসেবে রিকুইজিশন ন্যাপ গঠন করেন। স্বাধিকারের প্রশ্নে দৃঢ় ভূমিকা তার এবং তার সহকর্মীদের ওপর সরকারি নির্যাতন ডেকে আনে। তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আগাগোড়া তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এ সময় মধ্যবিত্তের সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং অন্য বামপন্থি ও কমিউনিস্টদের আত্মগোপনে থাকা আর গোপন বৈঠকের জন্য জায়গা বের করা ও অর্থ সংগ্রহের সুযোগ করে দেন।

’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে প্রফেসর মোজাফফর আহমদের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় পশ্চিম পাকিস্তানের ন্যাপ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশব্যাপী সফল হরতাল পালন করার ব্যাপারে তার বিশেষ ভূমিকা ছিল।

সামরিক একনায়ক আইয়ুবের পতনের পর স্বাধিকার আন্দোলন আরও গভীর ও ব্যাপক করার জন্য মোজাফফর এবং তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন এগিয়ে নেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে গিয়ে তাজউদ্দীন সরকার এবং ইন্দিরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। ত্রাণ শিবিরের জন্য খাদ্য ও অর্থের ব্যবস্থা করেন। তিনি বরাবর মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টিকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ মুক্তিফ্রন্ট গঠনের আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বরাবর কোনো ধরনের ঐক্যের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বিশ্বজনমতের সমর্থন পেতে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত ও বিশ্বের প্রগতিশীল মহলের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে মোজাফফর সাহেবকে নিয়ে উপদেষ্টামণ্ডলী গঠিত হয়। বিশ্বজনমতকে স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে আনতে বিদেশ সফর করেন। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সক্রিয় সমর্থন আদায় করার ব্যাপারে মোজাফফর বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তারই উদ্যোগে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনী গড়ে ওঠে। ভারতীয় কূটনীতিক ও ইন্দিরার সহযোগী ডিপি ধরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ মুক্তিযুদ্ধকে সঠিক ধারায় রাখতে সক্ষম হয়। দেশ হানাদারমুক্ত হওয়ার পর ন্যাপ দেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে জাতীয় সরকার গঠন এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানানো হয়। শেখ সাহেব সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। আওয়ামী লীগের অনেকেই দুর্নীতি-লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

ন্যাপ লুটপাটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। দেশে অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল মহল একের পর এক ষড়যন্ত্র করতে থাকে। শেখ মুজিব বেপরোয়া হয়ে আওয়ামী লীগসহ সব দল আইন করে বিলুপ্ত ঘোষণা এবং একদলীয় ‘বাকশাল’ গঠন করেন। অধ্যাপক মোজাফফরের সমালোচনা-পরামর্শ কোনো কিছুই কাজে লাগেনি। সিপিবির দ্বিতীয় কংগ্রেসে প্রফেসর বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ মুসলমানের দেশও বটে। তার এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বক্তব্যে সেদিন অনেকে তাকে ভুল বুঝেছেন। কিন্তু এখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ওই কথাটা বিবেচনায় রাখা কতটা জরুরি ছিলো। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর খুনি সেনাদের নিয়ে মোশতাক ক্ষমতায় আসে। এর পর জিয়াউর রহমান। সে সময় এয়ার মার্শাল তোয়াব কোণঠাসা খুনি অফিসারদের নিয়ে দেশকে আরও বেশি প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তোয়াব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সমাবেশে বিষোদ্গার করে। মওলানা ভাসানী, মোজাফফর প্রমুখ ওইসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। অবশ্য মোজাফফর সাহেবের সেই সময়ের ভূমিকা নিয়ে প্রগতিশীল মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।

পরবর্তীকালে সংসদে নির্বাচিত হয়ে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে গরিব মানুষের পক্ষে এবং সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

দুঃখের বিষয় তার ন্যাপের মধ্যেও ভাঙন দেখা দেয়। অনেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। পঙ্কজ ভট্টাচার্য ঐক্য ন্যাপ গঠন করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। অধ্যাপক মোজাফফর সভাপতি হতে রাজি হলে তিনি পদ ছাড়তে প্রস্তুত। কিন্তু প্রফেসর তো এখন প্রয়াত। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা, পুঁজিবাদী শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে অধ্যাপক মোজাফফর আমরণ আপসহীন ছিলেন। উপরোক্ত আদর্শগুলোকেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলি। দুঃখের বিষয়, জাতীয় ধারা থেকে আসা অনেকেই মুখে ওইসব চেতনার কথা বললেও বাস্তবে দ্বিধান্বিত ছিলেন এবং অনেকেই কৌশলের নামে আপসরফা করে চলেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে অধ্যাপক মোজাফফর এবং দৃঢ়তা ও নীতিনিষ্ঠতার জন্যই বাংলাদেশ সুবিধাবাদ ও আপসকামিতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব ব্যাপারে ন্যাপের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সামনের সারির নেতাদের মধ্যে একমাত্র মোজাফফর আহমদই বেঁচেছিলেন। তিনিও চলে গেলেন। বর্তমানে দেশে গণতন্ত্রহীনতা, দুর্নীতি, লুটপাট এবং অপরাজনীতির বিরুদ্ধে ন্যাপের মতো একটি দল নিয়ামক ভূমিকা রাখতে পারে। মোজাফফরের নেতৃত্বে ন্যাপ ছেড়ে যারা চলে গেছেন, নতুন দল গঠন করেছেন অথবা দল ছাড়া আছেন তারা আজ সব ভেদাভেদ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে এক পতাকা তলে দাঁড়াবেন- এটাই আজ ইতিহাসের দাবি। শুরু থেকে আমাদের মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ঐক্যবদ্ধ ন্যাপ সেই সংগ্রামকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে- এই আমাদের আশা। লেখাটি একতা-টিভি-অনলাইন থেকে নেওয়া

লেখক: মনজুরুল আহসান খান, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি


এখানে শেয়ার বোতাম