শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৬
শীর্ষ সংবাদ

অধ্যাদেশের ফাঁস ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

এখানে শেয়ার বোতাম
  • 204
    Shares

হাজরা আল আমিন::

ছাত্র রাজনীতিমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ব আছে।এখানে টেন্ডার ভাগাভাগি নেই, চাপাতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কাউকে ধাওয়া করতে দেখা যায় নি।তবে এই ছাত্র রাজনীতিমুক্ত অর্থাৎ দলীয় লেজুড়বৃত্তীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থেকেও যেভাবে অধিকার সচেতন হওয়া যায় সেই পথটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবিষয়ক অধ্যাদেশে মুক্তচিন্তা ও চর্চার জায়গাকে হত্যা করা হয়েছে। এর আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষার্থীদের আচরণ বিষয়ক অধ্যাদেশটি অস্পৃশ্য,অজানা।শিক্ষার্থীদের আচরণকে কেমন করে সজ্ঞায়িত করা হয়, অপরাধ করলে কোন ধরনের সাজা দেওয়া হবে, এসব শিক্ষার্থীরা কিছুই জানেনা। তবে মাঝে মধ্যেই নোটিশ বোর্ডে শাস্তির ধরণ দেখে অবাক হতে হয় এবং শিক্ষার্থীদের মনে একটি চাপা ভয় জমা হয়। দেখা যায় খেলার মাঠের সামান্য বিষয়কে গুরুতর জ্ঞান করে অর্থদন্ড থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত করা হয়। কখনও শিক্ষার্থীদের ফেসবুকের একান্ত গ্রুপের আলাপের কোনো অসঙ্গতিকে তুলে ধরে সাজা দেওয়া হয়, অভিযোগের তালিকায় কখনও দেখা যায় কোনো রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

অনেক শিক্ষার্থী নিজ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বিষয়ক অধ্যাদেশের খোঁজ খবর করলেও তার হদিস কখনও তারা পায়না। বরং প্রশাসন সেই শিক্ষার্থীর উপর নজর রাখে। খোঁজ খবর নেয় তার সকল কার্যক্রমের। ফলে কৌতুহোলের বশবর্তী হয়েও কোনো শিক্ষার্থী খুব সহজেই শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বিষয়ক অধ্যাদেশেরর বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে পারেনা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীকে আচরণের বেলায় অতিরিক্ত সচেতন থাকতে হয়। এই অতিরিক্ত সচেতনাকে তটস্থ বললে ভুল হবেনা।বিশ্ববিদ্যালয়ের পিয়ন পাহারাদার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির সাথে কথোপকথন ও আচরণের বেলায় সচেতন থাকা অর্থাৎ পারতপক্ষে নিশ্চুপ থেকে কার্য উদ্ধারের কৌশলটি রপ্ত করতে হয়।যদি কখনও কোনো শিক্ষার্থী ভুলবশত কোনো শিক্ষক,কর্মকর্তা বা অন্য কোনো কর্তা ব্যক্তির সাথে বিরুদ্ধমত পোষণ করে তাহলে তার ডিসিপ্লিন বা ক্ষেত্রবিশেষে ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের দপ্তরের কোনো পদস্থ শিক্ষকের ভৎর্সনা শুনতে হয়। আর বিরুদ্ধমত পোষণকারী শিক্ষার্থী যদি সক্রিয় সংগঠক হয়ে থাকে তবে শিক্ষার্থীর সামান্য আচরণকে অধ্যাদেশের বলে গুরুতর প্রমাণ করে সাজা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর এহেন কর্তৃত্ববাদী জমিদারি কাঠামোর সঙ্গে পেরে উঠেন না। ফলে একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়েরর সমগ্র পদ্ধতি হয়ে ওঠে অসহনীয়।

প্রসঙ্গত আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে,শ্রেনীকক্ষে একজন শিক্ষার্থী কতোটা স্বত:স্ফূর্তভাবে তার পাঠে অংশ নিতে পারে?
অধিকাংশক্ষেত্রে দেখা যায় শ্রেণীকক্ষে এক পাক্ষিক কতৃত্ব চলে,যে কতৃত্ববাদ সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে।শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক তার ধারণা মতো লেকচার দিয়ে চলে যায়। কোনো প্রশ্ন রাখার জায়গা সেখানে তৈরী হয়না। বরং শিক্ষকের বক্তব্যেরর প্রতিটি অংশের সঙ্গে হাস্য উজ্জ্বল মুখসহ সম্মতি প্রদান না করলে শিক্ষক রুষ্ট হন। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীকে এমন নিরব অস্ত্র বনে যাওয়ার পেছনে রয়েছে আরেকটি কার্যকরী অস্ত্র তা হলো পরীক্ষাতে কোনো কোডিং সিস্টেম বা দ্বিতীয় পরীক্ষক দিয়ে খাতা মূল্যায়নের সুযোগ নেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে প্রতিজন শিক্ষার্থীর খাতা থাকা অরক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাঠ চুকিয়ে পরবর্তী সময়ে অনেক শিক্ষার্থী আফসোস করেন তার পরীক্ষারর খাতা নিয়ে।

এবার আসি মূল আলাপে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষার্থীদের বেঁধে রাখা হয় অধ্যাদেশের ফাঁস দিয়ে। কতৃপক্ষের কঠোর কাঠামোর এদিক সেদিক হলেই শিক্ষার্থীকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় নানামাত্রিক পদ্ধতিগত শাস্তিতে। বছরের পর বছর বেতন ভাতার পরিমাণ বাড়তে থাকে। গভীর রাতে অসুস্থ হলে তৎক্ষণাত চিকিৎসা দেওয়ার কোনো উপায় নেই। মেডিকেল সুবিধা অপ্রতুল। একজন শিক্ষার্থীকে হলে সিট পেতে পেতে শিক্ষাজীবনের পরিসমাপ্তির ঘন্টা বেঁজে যায়।নতুন ডিসিপ্লিন খোলার পর পাঁচ ছয় বছর অতিবাহিত হলেও তারা সেমিনার লাইব্রেরীর সুযোগ পায়না। একটি রুম পর্যন্ত তারা পায়না। এতসকল সমস্যা থাকলেও কথা বলা আইনগতভাবেই নিষিদ্ধ।অধ্যাদেশ শিক্ষার্থীদেরকে একত্রিত হয়ে সমস্যা জানানোর কোনো সুযোগ দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সিদ্ধান্তে সমাবেতভাবে বিক্ষোভ জানানে শাস্তিযোগ্য অপরাধের শামিল। উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের আচরণ শৃঙ্খলাবিষয়ক অধ্যাদেশের কয়েকটি ধারা মুক্তিযুদ্ধ ভাবনার পরিপন্থী।বিশেষ করে ১৭ (খ) তে উল্লেখ আছে, “বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট আহ্বান করতে পারবেনা। ক্লাস, ল্যাবরেটরি,লাইব্রেরী এবং ফিল্ডওয়ার্কে যোগ দিতে ইচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীকে স্বাভাবিক চলাচলে বাঁধা দিতে পারবেনা। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়েরর অঙ্গনে কোনো অংশে অথবা এর পাশ্ববর্তী এলাকায় বিক্ষোভ সংগঠন কিংবা প্রদর্শন করতে পারবেনা।কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষার্থীগণ এ বিধান লঙ্ঘন করলে কতৃপক্ষ কতৃক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হবে।” ফলে অধ্যাদেশের ফাঁস দিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ইতিহাস আমদের এমন ভয়ঙ্কর বদ্ধকর অবস্থার কথা জানান দেয় যেমন : আইয়ুবী আমল, এরশাদের আমল। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করা, অধিকারের প্রশ্ন রাখা এবং ছাত্র শিক্ষক পারস্পরিক সংলাপের ভিত্তিতে পাঠ নেওয়ার জায়গাকে রুব্ধ করে দিয়েছে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাবিষয়ক অধ্যাদেশ।

তাই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাদেশের নামে যে ফাঁসকল চালু রাখা হয়েছে তা অচিরেই সংস্কার করতে হবে। একটি মুক্তদর্শী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে চর্চা অব্যাহত রাখার জন্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবিষয়ক অধ্যাদেশের সংস্কার সময়ের দাবী।

লেখক: হাজরা আল আমিন।


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 204
    Shares