সোমবার, নভেম্বর ২৩

অগ্নিযুগের বিপ্লবী নেপাল নাগ

Nepal-nag
এখানে শেয়ার বোতাম
  • 77
    Shares

অধিকার ডেস্ক:: নেপাল নাগ। ভারতীয় উপমহাদেশের বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন নেতা, অগ্নিযুগের বিপ্লবী, স্বদেশী এবং কমিউনিস্ট, রহমান ভাই নামে পরিচিত ছিলেন, একজন ভাষা সৈনিক, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।

১৯০৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ঢাকা শহরের তেজগাঁও জন্ম গ্রহন করেন। পিতার নাম সুরেশচন্দ্র নাগ। ভালো নাম শৈলেশ চন্দ্র নাগ হলেও নেপাল নামেই পরিচিত ছিলেন। নেপাল নাগ অল্প বয়স থেকেই স্বদেশী ভাবাপন্ন ছিলেন। আইএ পাস করার পর বিপ্লবী কাজকর্মে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

১৯২৩ সালে লীলা নাগ পরিচালিত “শ্রী সংঘ”-এ যোগ দেন। ঢাকা শহরের বুকে যারা গোয়েন্দা পুলিসের সহায়তা করত, তাদের শায়েস্তা করতে তখনকার অন্যান্য কর্মী সুপতি রায়, জিতেন দে প্রমুখ বিপ্লবীর সঙ্গে তিনিও ছিলেন। ১৯৩২ সালের ২১ এপ্রিল পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। রাজস্থানের দেউলি বন্দি নিবাসে সাত বছর আটক থাকেন। মুক্তির পর তৎকালীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। দেউলি কারাগারে আটক থাকার সময় মার্কসবাদী পণ্ডিত ও প্রবীন বিপ্লবী রেবতী বর্মণের কাছে কমিউনিস্ট মতাদর্শে দীক্ষা গ্রহণ করেন। বন্দীশালায় কমিউনিস্ট কনসোলিডেশনে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৩৮ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে কমিউনিস্ট নেতা মুজফ্‌ফর আহ্‌মেদ, প্রমোদ দাশগুপ্তর পরামর্শে বিহারে শ্রমিক সংগঠনের কাজ করতে যান। সেখান থেকে সফলকাম হয়ে ফিরলে তাকে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ এলাকায় সুতাকল শ্রমিকদের মাঝে পাঠানো হয়। সাধারন মানুষের সাথে দ্রুত মিশে যেতে পারার গুণ ছিল তার। নারায়ণগঞ্জের সুতাকল এলাকায় বলিষ্ঠ শ্রমিক আন্দোলন, বিশাল শ্রমিক ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তুলে সেখানকার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। এসময় কমিউন করে থাকতেন গোপনে অন্যতম বিপ্লবী জ্ঞান চক্রবর্তীর সাথে। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে শ্রমিকদের ভেতর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

১৯৪০ সালের জুন মাসে পুনরায় গ্রেপ্তার হন। একই বছর ডিসেম্বরে মুক্তি লাভের পর ঢাকায় সগৃহে অন্তরীণ থাকেন। কয়েক দিনের মধ্যেই অন্তরীনের বেড়াজাল ডিঙিয়ে গোপনে নারায়ণগঞ্জের সুতাকল অঞ্চলে গমন করেন। সেখানে আত্মগোপন অবস্থায় শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্বদান করেন।

১৯৪৩ সালের ১৭ মে কমরেড নেপাল নাগ বিয়ে করেন নিবেদিতা নাগকে।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর হতে “রহমান ভাই” নাম গ্রহণ করে আত্মগোপন অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করেন।
১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
১৯৪৯ সালে রেল ধর্মঘট করেন।
১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে ছাত্র-জনতার বিপ্লবীদেরকে নিয়ে আন্দোলন করেন।
১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের ক্ষেত্রে নেপাল নাগের উদ্যোগ ও কাজ স্মরণীয়।
১৯৬০ সালে মস্কোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব কমিউনিস্ট মহাসম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির গোপন প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৬১ সালে রাশিয়া কমিউনিস্ট পার্টির ২২তম কংগ্রেসেও পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিত্ব করেন। এসময় হোচিমিন, চৌএনলাই বিখ্যাত কমিউনিষ্ট নেতাদের সাথে তার আলোচনা হয় পূর্ববাংলার স্বাধীনতা নিয়ে।
১৯৬২ সালে দুরারোগ্য ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
১৯৬৪ সালে নেপাল নাগ আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট পার্টির চীনের নীতির পক্ষে সমর্থন জানিয়ে কলকাতায় কমিউনিষ্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া ( মার্কসবাদী) বা সিপিআইএমের রাজনীতিতে যুক্ত হন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কলকাতায় নেপাল নাগের বাড়িটি ছিল শরনার্থীদের ট্রানজিট ক্যাম্প। বাংলাদেশ থেকে দলে দলে লোকজন যেতেন এবং আশ্রয় নিতেন। দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়া মানুষগুলোকে চিকিৎসা-সেবা আর গন্তব্য ঠিক করে দিতেন নেপাল নাগ ও তাঁর স্ত্রী নিবেদিতা নাগ। মুক্তিযুদ্ধে যতটা বন্দুকের দরকার, চিকিৎসা সেবা-ওষুধ দরকার তা দিয়েই সাহায্য করতেন।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সুহৃদ কমরেড নেপাল নাগ,তার স্ত্রী নিবেদিতা নাগ এবং নিবেদিতা নাগের ভাই বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্র নাথ বোস ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিশাল ভুমিকা পালন করেন।

১৯৭৮ সালের ৪ অক্টোবর নেপাল নাগ কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

২০১২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য নেপাল নাগ, নিবেদিতা নাগ ও বিজ্ঞানী সত্যন্দ্র বসুকে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা দেয়া হয়। নেপাল নাগ ও নিবেদিতা নাগের ছেলে প্রকৌশলী সুজয় নাগ সম্মাননা গ্রহন করেন।

তথ্য সংগ্রহ : মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সভাপতি , সিপিবি


এখানে শেয়ার বোতাম
  • 77
    Shares